তিনি প্রতীক উর রহমান। সে অর্থে তিনি দলের হাইপ্রোফাইল যুবনেতা নন। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান শতরূপ ঘোষ। তবু, তাঁর 'পদত্যাগ'কে ঘিরে তোলপাড় সমাজমাধ্যম।
পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, সিপিআই(এম)-এর রাজ্য কমিটি থেকে প্রতীকের পদত্যাগ ঘিরে তোলপাড় পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। চব্বিশের লোকসভায়, ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বামজোটের প্রার্থী হচ্ছেন নওশাদ সিদ্দিকি, তা একরকম ঠিক হয়ে গিয়েছিল। নওশাদ নিজেও একাধিক জনসভায় তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রহস্যজনক কারণে সরে আসেন নওশাদ। ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক দাবি করেন, তিনি যেহেতু দলের অন্যতম মুখ, তাই কোনও একটি কেন্দ্রে আবদ্ধ হয়ে পড়লে দলের প্রচার মার খাবে। প্রশ্ন ওঠে, একেবারে শেষ মুহূর্তে নওশাদের এহেন আত্মোপলব্ধি কেন?
এই পরিস্থিতিতে, ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্ভেদ্য দুর্গে আঘাত ও প্রত্যাঘাতের জন্য তৈরি হন যিনি, তাঁর নাম প্রতীক উর রহমান। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা প্রতীক পরে দলের রাজ্য কমিটির সদস্য হন। লোকসভা ভোটের দিন ডায়মন্ড হারবারে অসম লড়াইতে প্রতীকের প্রতিরোধ নজর কাড়ে। মার খেয়েও একেবারে শেষ অবধি মুহূর্ত বুথ আগলে রাখেন প্রতীক ও তাঁর সহযোদ্ধারা।
প্রশ্ন, পরাজয় এক প্রকার নিশ্চিত জেনেও ডায়মন্ড হারবারের মতো লোকসভা কেন্দ্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে রাজি হলেন যে-প্রতীক, দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর কী-এমন মতবিরোধ হল যে, বিষয়টি পদত্যাগ পর্যন্ত পৌঁছল?
প্রতীক উর-এর প্রতিক্রিয়ায় তা স্পষ্ট হল না একেবারেই। কারণ, 'দলের অভ্যন্তরীণ' বিষয়কে সংবাদমাধ্যমের সামনে হাট করে খুলে দিতে রাজি নন তিনি। এমতাবস্থায়, সমাজমাধ্যমে যে-পদত্যাগ পত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে, সত্যি হোক কি মিথ্যে হোক, তার দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পদত্যাগের কারণ হিসেবে কী লিখেছেন প্রতীক দেখা যাক।
"কমরেড, আমি প্রতীক উর রহমান, পার্টির একজন সর্বক্ষণের কর্মী। সাম্প্রতিক সময়ে পার্টির জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের বেশ কিছু ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছি না। মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। এই অবস্থায় আমি পার্টির জেলা ও রাজ্য কমিটির দায়িত্ব তৎসহ পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার এই সিদ্ধান্ত আপনাকে (রাজ্য সম্পাদক) অবগত করলাম"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই পদত্যাগ পত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও অব্যাহতি নিচ্ছেন প্রতীক!
কিন্তু কেন?
তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ প্রতীকের এই পদত্যাগ পত্র পোস্ট করে নাম না-নিয়ে সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে দায়ী করেছেন। কুণাল লিখেছেন:
"সিপিএমের বায়োলজিকাল ফেরেব্বাজ নেতৃত্বের অংশ ও ফেসবুকের সভ্যতাহীন ফুটেজ বিপ্লবীদের দাপটে সিপিএমেরই প্রথম সারির যুবনেতাদের অবস্থা ও সিদ্ধান্ত এরকম। এসএফআই শীর্ষ নেতা, জেলা নেতা, রাজ্য কমিটির কিছু দায়িত্বে থাকা ও গত লোকসভায় ডায়মন্ড হারবারে সিপিএম প্রার্থী প্রতীক উর। সিপিএমকে সর্বস্তরে শূন্যতে নামানো সম্পাদক ও তাঁর কিছু অযোগ্য বাতেলাবাজের কাঠিবাজিতে এই সিদ্ধান্ত বলে খবর। চিঠির সত্যতা যাচাই করতে পারিনি। ভুল হলে ডিলিট করে দেবো"।
পর্যবেক্ষকদের বুঝে নিতে অসুবিধে হচ্ছে না যে, কুণালের আক্রমণের তির কাদের দিকে। মহম্মদ সেলিম ও 'বাতেলাবাজ' শতরূপ ঘোষকে লক্ষ্য করেই যে তির ছুড়েছেন কুণাল, তা স্পষ্ট।
পর্যবেক্ষকদের কাছে কুণালের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আর একটি পোস্ট। এবং তা হল, তরুণ বামপন্থী নাট্যকার সৌরভ পালধির পোস্ট: 'প্রতীক উর রহমান প্রয়োজনীয়। ব্যাস, আর কিছু আপাতত লিখবো না'। নিচে বড়বড় হরফে নীল রঙে ইংরেজিতে লেখা: Pratikur Rahaman ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, রাজ্যে সিপিআই(এম) এখন কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত, সেলিম-সিপিএম আর সুজন-সিপিএম। তৃণমূল নেতৃত্বকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, এখন সেলিম-সিপিএমের রমরমা। যদিও, দলে এমন কোনও বিভাজন আদৌ নেই বলে দাবি বাম নেতৃত্বের। তবে, ঘটনা যা-ই ঘটুক-না কেন, কোথাও যে একটা গোল বেধেছে তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। নইলে সৌরভ পালধি বড়-বড় হরফে এমন পোস্ট করে লিখবেন কেন: 'প্রতীক উর রহমান প্রয়োজনীয়। ব্যস, আর কিছু আপাতত লিখবো না'। ছোট্ট দুই বাক্যের ব্যাপ্তি বহুদূর, মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।