ভিনরাজ্যে জেলার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে সম্প্রতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা। জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চলে। এবং, প্রথমদিনের মতো অবরোধ উঠলেও, ভিনরাজ্যে আরও একজনের মৃত্যুর খবরে দ্বিতীয় দিন ফের অবরোধ হয়। অবশেষে লাঠি চালিয়ে অবরোধকারীদের হটিয়ে দেয় পুলিস।
বিক্ষোভ অবরোধ চলাকালীন বেলডাঙায় সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনাও ঘটে। এবং সেই ঘটনায় গ্রেফতারও করা হয় বেশ কয়েকজনকে। এমতাবস্থায়, বঙ্গবিজেপি এনআইএ তদন্ত দাবি করে। রাজ্য তার বিরোধিতা করে। এবং শেষ অবধি অনেক কোর্ট-কাছারির পর বেলডাঙার তদন্তভার যায় এনআইএ-র হাতে।
ওই মামলার তদন্তে কেস ডায়েরি নিয়ে যখন রাজ্য পুলিসের সঙ্গে এনআইএ-র সংঘাত চরমে উঠেছে, ঠিক তখনই মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর অবস্থান রাজ্য সরকারের সঙ্গে মিলে গেল। এদিন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে বহরমপুরের পাঁচবারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী বললেন, "বেলডাঙা নিয়ে এনআইএ তদন্তের কোনও প্রয়োজনই নেই। কী হয়েছে বেলডাঙায়? কজন পুলিস গুলি খেয়েছে, কজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কটা দোকানে আগুন লাগানো হয়েছে? একটা ফালতু কাজ এনআইএ-কে দিয়ে করানো হচ্ছে। জানি না, এনআইএ-র হাতে আর কাজ আছে কি না। এত ফালতু কাজ এনআইএ করতে পারে, তা আমার ধারণা ছিল না।
বেলডাঙা: ঘটনার সূত্রপাত
কিছুদিন আগেই ওড়িশার সম্বলপুরে নিহত হয়েছিলেন সুতির পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল শেখ। তাঁর নিথর দেহ মুর্শিদাবাদে আসার পর অধীর চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছিলেন, "ঘটনা ঘটবে আর তারপর প্রতিবাদ হবে, ব্যস? পরিযায়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজা হচ্ছে না কেন"? বেলডাঙার পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর পরও তাঁর মুখে শোনা গেল 'স্থায়ী সমাধানে'র কথা।
বহরমপুর থেকে নির্বাচিত পাঁচবারের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী চব্বিশের লোকসভায় তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজিত হন। যদিও, পঁচিশের ওয়াকফ আন্দোলনে যখন উত্তাল হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদ, রীতিমতো সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়, তখন সমাজমাধ্যমে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার ছবি শেয়ার করেন গুজরাতের বাসিন্দা ইউসুফ। যা নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বকেও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। এই ঘটনার কিছুদিন পর মুর্শিদাবাদের থেকে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া একের-পর-এক পরিযায়ী শ্রমিকের নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। রণাঙ্গনে দেখা যায় চব্বিশের পরাজিত সৈনিক অধীর চৌধুরীকে। ফের পুরনো মেজাজে পথে নামেন 'মুর্শিদাবাদের রবিনহুড'। জুয়েল শেখের মৃত্যুর পর একেবারে ওড়িশায় গিয়ে সেখানকার প্রশাসন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন অধীর চৌধরী। শুধু তা-ই নয়। মুর্শিদাবাদের এক পরিযায়ী শ্রমিক তামিলনাড়ুতে গত ছ-মাস ধরে গরাদের ভিতর রয়েছেন বলে তখন দাবি করেন তিনি। সেখানকার কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কথাও বলেন একদা লোকসভায় কংগ্রেসের নেতা অধীর চৌধুরী। সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি বলেন, "বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাংলাদেশি নন, বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আশা করি, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারবো। ওড়িশার কেওনঝড়ে সমস্যায় পড়েছেন জেলার পরিযায়ী শ্রমিকরা। তাঁরা ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না। আমি সেখানকার এসপি-র সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এর একটা স্থায়ী সমাধান খুঁজে বার করা দরকার"।
এরপর, দিল্লিতে সটান প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে নরেন্দ্র মোদীর কাছে বাংলার পরিযায়ী-হেনস্থার প্রতিকার চান অধীর চৌধুরী।
জুয়েল শেখের মৃত্যুর পর স্থায়ী সমাধানের সূত্র দেন অধীর চৌধুরী। এবং, আলাউদ্দিন শেখের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সময়ে তাঁর মুখে শোনা যায় স্থায়ী সমাধানের কথা: ১ ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের ইউনিক আইডেনটিটি কার্ড দিতে হবে। ২ সেই কার্ডে স্পষ্ট লেখা থাকবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের কোথায় থাকেন এবং কোন থানার অধীনে তাঁর বাড়ি। সেই সঙ্গে স্থানীয় থানা ও জেলা পুলিসের ফোন নম্বর দেওয়া থাকবে। বাংলাদেশি কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিলে, ভিনরাজ্যের প্রশাসন যাতে এ রাজ্যের প্রশাসনের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ পারে। ৩ দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যে একজন করে ওয়েলফেয়ার অফিসার নিয়োগ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। তাঁদের কাজ হবে, সেই রাজ্যে বাংলার পরিযায়ীদের সমস্যার কথা শোনা ও তার সুরাহার জন্য পদক্ষেপ করা। বিপদে-আপদে ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ীরা যাতে ওই অফিসার ও তাঁর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ৪ ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ী-হেনস্থার বিষয়টিকে আরও বেশি করে, বিজেপি-সহ দেশের বিভিন্ন দল ও তাঁদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরতে হবে।
উত্তপ্ত বেলডাঙা
বেলডাঙা গিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে অধীর স্পষ্ট জানান, "আমি এখানে বাইট দিতে আসিনি। আমাকে কাজটা করতে দিন"। 'কাজ' বলতে? ঝাড়খণ্ড প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আলাউদ্দিনের রহস্যমৃত্যুর দ্রুত তদন্তের দাবি করা। তার কারণ, ছবি দেখে মনে করা হচ্ছে, আলাউদ্দিন আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে মেরে ওইভাবে সিলিংফ্যানের সঙ্গে কাপড় বেঁধে মেঝেতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এমতাবস্থায়, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও অভিযুক্তদের হেফাজতে নেওয়ার খবর পেলেও অগ্নিগর্ভ বেলডাঙা কিছুটা হলেও শান্ত হবে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, বেলডাঙায় এনআইএ তদন্ত নিয়ে অধীরের অবস্থান সে অর্থে অযৌক্তিক নয়।