বামজমানায় ১৯৯৩ সালের একুশে জুলাই মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন ‘যুব কংগ্রেসনেত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দাবি ছিল: সচিত্র ভোটার কার্ড। যদিও, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টিএন শেষন ইতিমধ্যেই তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। এমতাবস্থায়, জাতীয় নির্বাচন কমিশন কী করবে-না-করবে, মহাকরণ থেকে রাজ্য সরকার তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কী করে, তা নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন। এবং, সচিত্র ভোটার কার্ডে দাবিতে মহাকরণ অভিযান কতটা যুক্তিযুক্ত, সিপিএম-বিরোধীরাও কেউ কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ওই অভিযানের দিন পুলিসের গুলিতে ১৩ জন নিহত হন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে তখন জ্যোতি বসু। এবং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
দ্বিতীয় পর্ব
তরতাজা ১৩ জনের রক্তে ‘একুশে জুলাই’ একটি ‘ইভেন্টে’ পরিণত হয় তারপর থেকে। প্রথমে কংগ্রেসের ব্যানারে, পরে তৃণমূলের ব্যানারে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে প্রতিবছর নিয়ম করে ২১ জুলাই পালন করে এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর একুশে জুলাই ‘মেগা ইভেন্টে’ পরিণত হয়। শহিদ তর্পণের মঞ্চ ‘পাগলু ড্যান্সে’র মঞ্চে পরিণত হয়।
২০১১ সালে বাংলায় পালাবদলের পর বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন তৈরি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিশনের তরফে ডাকা হয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। তিনি মাথা উঁচু করে কমিশনে গিয়ে তাঁর যা বলার তা স্পষ্ট বলেছিলেন।
সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন
যদিও, সবকিছু সত্ত্বেও সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়-কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনেননি মমতা। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে লাশের রাজনীতি করতেই কি সেদিন মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন মমতা? পর্যবেক্ষকরা মনে করাচ্ছেন সোনালি গুহর কথা। পালাবদলের পর এক লেখায় ও সাক্ষাৎকারে একদা মমতার ছায়াসঙ্গী জানান, ওইদিন বোরখা পরে জ্যোতি বসুর কনভয়ের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। এবং, সোনালি যখন বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন, তখন কিন্তু বাংলায় পালাবদল হয়ে গিয়েছে এবং মমতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এতটুকু খারাপ হয়নি (আজকের মতো)। সোনালি সেদিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বোরখা পরলে পুলিস তাঁদের চিহ্নিত করতে পারবে না। কিন্তু, হাতের আংটি বা চুড়ি, কোনও কিছু একটা পুলিসের নজরে পড়ে। পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এই ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কিছু দিন, বেশ কিছু বছর। বাংলার আরও একবার পরিবর্তন হয় ও ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী।
এমতাবস্থায়, বিরোধী দল হিসেবে একাধিক শিবিরে ভাগ হয়ে যায় তৃণমূল। বিধানসভায় স্বীকৃতি পায় ঋতব্রত-তৃণমূল। এবং, কালীঘাট-তৃণমূল দাবি করে তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল।
এই ভাগাভাগির খেলায় কামারহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ঘাসফুল প্রতীকে জয়ী বিধায়ক মদন মিত্র ঋতব্রত-তৃণমূলে যোগ দেন এবং তারপর থেকেই তাঁকে ক্রমাগত নিশানা করে কালীঘাট-তৃণমূল। অবশেষে, একট ভিডিয়ো পোস্ট করে পাল্টা তোপ দাগেন মদন। এবং, সেই বার্তায় তিনি যা বলেন, তাকে ‘বিস্ফোরক’ বললেও কম বলা হয়।
২১ জুলাই, ১৯৯৩, মমতা-মদন সাক্ষাৎ
“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে বললেন, আজকে ( ২১ জুলাই, ১৯৯৩) এমন একটা কিছু করতে হবে, সারা জীবন যাতে মনে রাখে। তখন সকাল সাড়ে ৮ টা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে ব্রাশ করছিলেন। ২১ জুলাই, ১৯৯৩। ওখান থেকে আমি কিছু ইনস্ট্রাকশন নিয়ে বেরিয়ে এলাম। তারপরেই ঘটনা ঘটেছে পরপর, আপনারা জানেন, ১৩ জন মারা গিয়েছিলেন”।
পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন, এই কারণেই কি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়-কমিশনের রিপোর্ট ক্ষমতায় থাকতে কোনও দিন প্রকাশ্যে আনেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?