Updated on : 6 June 2026 | 12:11:23 pm
Updated on : 6 June 2026 | 12:11:23 pm
কল্য়াণ (খরদহ): ত্রি-সার্ধ শতবর্ষ অতিক্রম করেছে তাঁর রাজ্যাভিষেকের দিনটি। জ্যৈষ্ঠের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে ১৬৭৪ খ্রীষ্টাব্দে মহারাষ্ট্র-ক্ষত্রিয়-কুলাবতংস ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ রাজ্যাভিষিক্ত হন। দুর্দ্ধর্ষ মুসলমান শক্তির সঙ্গে নিয়ত সংগ্রাম করে হিন্দুশক্তির জয়ের দিনটির স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে রয়েছে জ্যৈষ্ঠের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। সেই শুভক্ষণে মহারাষ্ট্রের রায়গড় দুর্গে অসামান্য দূরদর্শী এক হিন্দু যোদ্ধা সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়ে পরাধীন ভারতবর্ষের মাঝে এক স্বাধীন হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করে তুললেন। এ যে কত বড় জয়, ভাবা যায় না। এই সমারোহটির ফলশ্রুতিতে রক্ষা পেল হাজার হাজার বছরের সনাতনী ভারত-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ, পুনরুজ্জীবিত হল বেদ-বিদ্যার মণিমাণিক্য, রক্ষা পেলো গো-ব্রাহ্মণ, হিন্দু তীর্থের ধ্বজপতাকা। হিন্দুধর্মের বিজয়বৈজয়ন্তী যদি সে সময়ে অর্থাৎ সপ্তদশ শতকে পুনরায় উড্ডীন না হত, চিরকালের জন্য হারিয়ে যেত এই উচ্চ দর্শনের ধারা। পৃথিবী হয়ে উঠতো বাকীদের লড়াই এবং দখলের ক্ষেত্র। ভারতীয় মহাপুরুষের মহত্ত্ব প্রকাশ করবার জন্য অবশিষ্ট থাকতেন না কেউ। শিবাজির সীমাহীন সাহস ও সৌকর্যের সার্থকতা এই কারণেই।
মুঘল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও যে ফের হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপন করা সম্ভব, দেখিয়ে দিয়েছেন ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ। শিবাজির তপস্যাতেজের রূপ কি দেখেছে বাঙালি হিন্দু? বুঝেছে কি সেই রুদ্রলীলা? একদিন মারাঠার প্রান্ত থেকে ভৈরব রবে ধর্মরাজ শিবাজি আমাদের ডাক দিয়েছিলেন! চমকেছিল তাঁর কৃপাণদীপ্তি! মৃত্যুহীন বাণী-রূপ এনে দিয়েছিল নতুন প্রভাত। 'একধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে' এই সম্বলই ছিল তাঁর মহাবচন। সেদিন যদি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে না থাকি আমরা, তবে রাবীন্দ্রিক ভাষায় আজই বলার সময় এসেছে --
"মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কণ্ঠে বলো
'জয়তু শিবাজি'।
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসব সাজি।
আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পুরব
দক্ষিণে ও বামে
একত্রে করুক ভোগ একসাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।"
তিনি মহারাজ শিবাজি। তিনি মধ্যযুগীয় ভারতে হিন্দু রাজা হয়ে একটি অসাধ্য সাধন করলেন। মোঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধী হয়ে বিক্ষিপ্ত পরাজিত এক জাতিকে নবজীবন দিলেন, স্বাধীনতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন হিন্দুকে, শ্রেষ্ঠ প্রশাসক হিসাবে প্রমাণ করে দিলেন হিন্দুরাষ্ট্রের সমস্ত বিভাগের কাজ চালিয়ে ধর্মরক্ষা করতেও সমর্থ্য হিন্দু। দীর্ঘ সময় পরাধীনতার নাগপাশে বাঁধা থেকে আজকের দিনে রাষ্ট্রনির্মাণে হিন্দুদের যে বোধ, তার শুভ সূচনা ঘটেছিল শিবাজির রাজ্যাভিষেকে।
'মারাঠা' বলতে বাইরে থেকে যে 'নেশন' বা জনসঙ্ঘ বুঝি, তা আদতে যুগের প্রয়োজনে কয়েকটি জাত বা কাস্ট এক ছাঁচে ঢালা হয়ে অগ্রসর হয়ে যাওয়া একটি 'রাষ্ট্রসঙ্ঘ', যা ভারতের অন্য কোনো প্রদেশে কখনও সম্ভব হয় নি৷ শিবাজি যে হিন্দু-আধারিত মারাঠা-মিলন গেঁথে তুললেন, বা তার আগেই সেই কাজটি ধীরে ধীরে চলছিল, যা শিবাজির সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর পুত্রপৌত্রদের রক্তদানে সংহত হয়ে উঠলো, তা এক যুগধর্মের প্রয়াসে এবং প্রচেষ্টায়। 'মারাঠা' জাত এবং তার নিকটাত্মীয় 'কুনবী' জাতের অধিকাংশই একদা সৈন্য ও প্রহরীর কাজ করেছে৷ এই দুই জাতের সমন্বয়েই শিবাজির সেনাদল গড়ে উঠেছিল, যদিও তাঁর সেনাবাহিনীতে সেনাপতি বরণের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরাও ছিলেন। এই বিক্রম, এই বীর্য তারা কোথা থেকে পেলেন? পেলেন মহারাষ্ট্রের মতো প্রকৃতিদেবীর হাতে গড়ে তোলা দেশময় গিরিদুর্গের অধিকারী হয়ে। পেলেন সহ্যাদ্রি পর্বতশ্রেণীর পাহাড় বনে ঢাকা দুর্গম অঞ্চলে দীর্ঘদিন নির্জন বাসের ফলে। আত্মরক্ষা করতে ও আক্রমণকারীকে বাঁধা দিতে দিতে। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে চীনা পর্যটক মারাঠা জাতিকে দেখেছিলেন সাহসী, বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী, তেজী ও যুদ্ধপ্রিয় হিসাবে --- যারা উপকারে কৃতজ্ঞ, কিন্তু অপকারে প্রতিহিংসা নেবার আগে শত্রুকেও শাসিয়ে যায়৷ এখন আধুনিক মারাঠা জাতের যে শাখায় শিবাজি আবির্ভূত হয়েছিলেন, তারা হলেন 'ভোঁশলে', জমি-চাষ ও পশুপালনই ছিল তাদের জাতিগত ব্যবসা। কিন্তু ষোড়শ শতকের প্রথমে বহমানী সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার সময় এবং তার একশ বছর পর আহমেদনগরে নিজামশাহি রাজবংশের পতনের সময়ে এই জাতি হাল ছেড়ে হাতে তলোয়ার ধরে নিল, শুরু করলো সৈনিকের ব্যবসা, ক্রমশঃ হয়ে উঠলো জমিদার এবং রাজা, সৈন্যের দলপতি, রাজদরবারে সামন্ত এবং অবশেষে স্বাধীন নরপতি।
নানান সদগুণের আধার ছিলেন তিনি; স্বাধীনতার উপাসক, বীরেন্দ্র সমাজের বরণীয় তিনি; কিন্তু রিপুর বশবতী ছিলেন না, ছিল উদারতা, সদাচার পরায়ণতা, সাধু সহবাসের আকাঙ্ক্ষা। তাঁর রাজত্বে নারীর মর্যাদা ছিল প্রশ্নাতীত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তাঁর উপর যে দুর্নাম আরোপ করেছেন তাঁর সঙ্গে বাস্তবতা কোনো যোগ ছিল না বলে প্রমাণ সহযোগে উপস্থাপন করেছেন ১৩০৯ বঙ্গাব্দে শিবাজি মহোৎসব উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে সখারাম গণেশ দেউস্কর। বিধর্মী ও বিজেতৃ জাতির দ্বারা বিজিত জাতির ইতিহাস লেখা হলে এমন ভ্রম বিচিত্র নয় বলেই তাঁর অভিমত।
শিবাজির রাজপতাকা ছিল 'ভাগবে ঝাণ্ডা', যা আসলে এক গেরুয়া উত্তরাধিকার। শিবাজির দীক্ষাগুরু ছিলেন রামদাস স্বামী, যার জন্য সাতরা দুর্গ জয় করার পর সজ্জনগড়ে আশ্রম নির্মাণ করে দিয়েছিলেন শিবাজি (১৬৭৩)। গুরুকে অঢেল ধন আর ঐশ্বর্য দান করলেও তাঁকে দৈনিক ভিক্ষায় যেতে দেখে শিবাজি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। গুরুদেবের সাধ মেটাবেন, পণ করলেন শিবাজি। রাজ্যের যা কিছু সম্পদ, এমনকি গোটা মহারাষ্ট্র রাজ্যটাই গুরুকে দান করার শপথ নিলেন। এরজন্য যাবতীয় দলিল - দস্তাবেজ প্রস্তুত করলেন শিবাজি, তৈরি হল দানপত্র। পরদিন সকালে গুরু রামদাস যখন ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বের হবেন, স্বয়ং মারাঠা রাজ তথা হিন্দু-অস্মিতা শিবাজি গুরুর পদতলে সমর্পণ করলেন সমগ্র রাজ্য। গুরু শিষ্যকে বুকে টেনে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "তোমার দান আমি গ্রহণ করলাম; এখন থেকে তুমি আমার গোমস্তা হলে। ভোগসুখী ও স্বেচ্ছাচারী রাজা না হয়ে বিশ্বাস করো, তুমি যেন এক জমিদার প্রভুর বিশ্বাসী ভৃত্য হয়ে রাজকার্য পরিচালনা করছো। এমনই রাজ্যশাসনের দায়িত্বজ্ঞান যেন তোমার থাকে।" ছত্রপতি শিবাজি মেনে নিলেন হিন্দু যোগীর সর্বাধিনায়কত্ব। সেই থেকে শিবাজির রাজ্য পরিণত হল এক হিন্দু সন্ন্যাসীর ভাবাদর্শে-চালিত রাজ্য, এক যোগী-রাজ্য। রামদাস স্বামীর রাজ্যধিকার চিহ্নিত হয়ে থাকলো মহারাষ্ট্র সাম্রাজ্যের জাতীয় পতাকা গৈরিক বর্ণে রঞ্জিত হয়ে। সন্ন্যাসীর গেরুয়া বস্ত্রখণ্ড দিয়েই নির্মিত হল রাজপতাকা।
রামদাস স্বামী প্রণীত 'দাসবোধ' গ্রন্থটি শিবাজি নিত্যপাঠ করতেন। শিবাজির ধর্মানুরাগের প্রাবল্য কখনও হ্রাস পায় নি। তাঁর নিজের মনেও এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, মা ভবানী স্বয়ং স্বরাজ্যস্থাপন ও স্বধর্মরক্ষার জন্য তাঁকে প্রেরণ করেছেন। এই অটল ভগবন্নিষ্ঠা ও বিশ্বাসই তাঁকে 'মারাঠাশাহী'-র প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ করেছে। সমর্থ করেছে মোঘলশাহি, আদিলশাহি ও কুতবশাহির বুকে হিন্দুরাজ্যে পতাকা উড্ডীন করতে৷
স্বধর্মের দুর্দশা দেখে ব্যথিত রামদাস শিবাজি এবং তাঁর কর্মচারীদের ক্ষাত্রধর্ম সম্পর্কে দীর্ঘ উপদেশ দিয়েছেন। এই উপদেশে শিবাজি জারিত ছিলেন বলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। গুরু রামদাস বলছেন, "যিনি মৃত্যুকে ভয় করেন, তাঁহার ক্ষাত্রধর্ম অবলম্বন করা উচিত নহে -- অন্য কোনও উপায়ে উদরপূর্তি করা কর্তব্য। যাহারা সমরে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, তাহাদিগকে ইহলোক লজ্জা ও অপমান এবং মরণান্তে নরকভোগ করিতে হয়।... কামানের গোলা যেরূপ নির্ভয়ে সৈন্যদলের মধ্যে গিয়া পতিত হয়, প্রকৃত ক্ষত্রিয় সেইরূপ নিঃশঙ্কচিত্তে শত্রুসৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করেন। সকলে একোদ্যমে উত্থিত হইলে শত্রুদিগের জন্য আর ভয় কি? ব্যাঘ্র যেরূপ সর্ব-সমক্ষে মৃগযূথকে ধরাশয়ী করে, ঐরূপে উত্থিত হইলে শত্রুদিগকেও সেইরূপে বিনষ্ট করিতে পারা যায়।" এমন গুরুর সামীপ্যে-সান্নিধ্যে থাকার জন্য শিবাজি মহারাজ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি।
আমরা শিবাজি-রামদাস দ্বৈরথটিকে আধুনিক ভারতে খুঁজে পাই স্বামী প্রণবানন্দ ও ড. শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে হিন্দু জাতি-গঠন-ভাবনার উত্তরাধিকার রচনায়। যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ হিন্দু-জাতি-গঠন সংক্রান্ত নানা ভাষণ ও কাজে বারবার হিন্দু সম্রাট ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতেন। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দু সম্মেলনে হিন্দু রক্ষীদল গঠনের আহ্বান জানান তিনি এবং হিন্দু সমাজের বিপন্নতার বিষয় তুলে ধরেন। কারণ ১৯৩৭ সালের পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে মুসলমান আধিপত্যবাদ বাঙ্গালি হিন্দুজীবনে গভীর সংকট তৈরি করেছিল। নোয়াখালিতেও তার বত্যয় ঘটলো না, গোলাম সারওয়ার ও গোফরানের নেতৃত্বে কৃষক সমিতির অন্তরালে একদল মানুষ হিন্দুদের মধ্যে ক্রমাগত আতঙ্ক সৃষ্টি করছিল; তারপর যা হয়েছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী। ১৯৪০ সালের ৭ ই মে নোয়াখালিতে অনুষ্ঠিত হিন্দু সম্মেলনে হিন্দু রক্ষীদল কেমন হবে, তা বলতে গিয়ে স্বামীজি বললেন, "ছত্রপতি শিবাজি, শিখগুরু গোবিন্দ সিংহের জাতি গঠনের পদ্ধতি যেমন ছিল, আমার হিন্দু-জাতি-গঠন-আন্দোলনও সেই ধারায় পরিচালিত।" স্বামীজির আশীর্বাদধন্য ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, যাকে 'শিবাজির কার্যকরীরূপ' বলে বর্ণনা করা হয়, তিনি নোয়াখালির হিন্দুদের দুর্দশাকে এবং তার মোকাবিলাকে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অগ্রাধিকার দিলেন। স্বামীজি এই যাত্রায় দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসকারী শিবের রুদ্রমূর্তি সঙ্গে নিয়েছিলেন আর সঙ্গে নিয়েছিলেন বাছাই করা বীরদের। "আমি কোনো কাপুরুষকে আমার সঙ্গে নেবো না, মাথা দিতে পারে, মাথা নিতে পারে -- এমন লোক আমার সঙ্গে চলুক।" ত্রিশূল হস্তে আচার্য দেব মঞ্চে সর্বদা সমাসীন থাকতেন, পরীধানে পীতোজ্জ্বল কৌষেয় বসন, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, মূর্তিতে শিবাজির পথে হিন্দুজাতি গঠন ও ধর্মরক্ষার বাণী। তাঁর সাফ কথা, "হিন্দু শির দিয়েছে, কিন্তু সার দেয় নাই।" আগের দিন ৬ ই মে পূর্ববঙ্গের বাবুরহাট সম্মেলনেও বললেন, "আজ প্রত্যেক হিন্দুকে রাণাপ্রতাপের মত, ছত্রপতি শিবাজীর মত, শিখগুরু গোবিন্দ সিংহের ন্যায় স্বধর্ম ও স্বসমাজের রক্ষার ব্রত ও দায়িত্ব গ্রহণপূর্বক জাতি-গঠন মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে।" বাঙ্গালি হিন্দুর শিরায় শিরায় দুর্জয় বীর্যসঞ্চারের জন্য হৃদয়ে দুর্দম সঙ্কল্প প্রবাহের জন্য ১৩ ই মে কুমিল্লার হিন্দু সম্মেলনে স্বামীজি আবার শিবাজি-স্মরণ করলেন, "শিবাজি ও গুরুগোবিন্দ সিংহ যে পন্থায় যথাক্রমে মারাঠী ও শিখ জাতিকে মহাজীবন দান করেছিলেন, আমি বাঙ্গলায় সেই সংগঠন-পদ্ধতিক্রমে পরাক্রমশালী হিন্দু-সংহতি গঠনে বদ্ধপরিকর। এই আত্মরক্ষা ও আত্মগঠন প্রচেষ্টাকে যথেষ্ট প্রবল করে তুলতে পারলে হিন্দুসমাজের যাবতীয় তুচ্ছ ভেদ-বিবাদ ঘৃণা-বিদ্বেষ বিদূরিত হয়ে যাবে।"
এরপর দেখা যায় যুগাচার্য হিন্দুদের পাশে সতত অবস্থান করবার এক প্রবল পরাক্রমশালী হিন্দু নেতার সন্ধানে রত হলেন, যার মধ্যে শিবাজির মতো অকুতোভয় শক্তি সঞ্চারিত আছে। অবশেষে ১৯৪০ সালের ২৬ শে আগষ্ট জন্মাষ্টমীর দিন আপন মাল্যে বরণ করে নিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে, নিজের সামূহিক-শক্তি সঞ্চারিত করে দিলেন, বাঙ্গালির জন্য এক শিবাজি-প্রতিম নেতা নির্বাচন করে গেলেন। ওই বৎসরই শৈবপীঠ বারাণসীতে দুর্গাষ্টমীর দিন শ্যামাপ্রসাদকে রুদ্ধদ্বারে ডেকে নিয়ে জাগালেন তার মধ্যে থাকা যাবতীয় উদ্যম ও নৈপুণ্য। প্রণবানন্দ-জীবনীকার স্বামী বেদানন্দ 'শ্রীশ্রী যুগাচার্য জীবন চরিত' গ্রন্থে খোলাখুলি লিখেছেন, "নিরপেক্ষভাবে বিচার করিলে শ্যামাপ্রসাদের প্রচেষ্টা ও সাফল্য মেবারের মহারাণা প্রতাপ অথবা মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি শিবাজীর কীর্তির সহিত তুলনীয়।.... আচার্যের আশীর্বাদ শক্তিসমৃদ্ধ-শ্যামাপ্রসাদের অন্তরে সুপ্ত সিংহ গর্জন করিয়া উঠিল। বাংলার তথা সমগ্র ভারতের নেতাদের বিরুদ্ধে তিনি একক মহাবিক্রমে অভ্যুত্থান করিলেন। পাকিস্তান-রাক্ষসের কবলে সমগ্র বাংলাকে উৎসর্গ করিবার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া বাংলার এক-তৃতীয়াংশ পশ্চিমবঙ্গ ছিনাইয়া আনিয়া বাঙালি হিন্দুর দাঁড়াইবার স্থান ও অস্তিত্ব রক্ষার উপায় করিয়া দিলেন।...বাংলার বীর সন্তান শ্যামাপ্রসাদের জীবন-মাধ্যমে এইরূপে আচার্যের বাংলা ও বাঙালি জাতির রক্ষার সঙ্কল্প রূপায়িত হইয়াছিল।"
স্বামী প্রণবানন্দজীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো 'মহামৃত্যু কি?' (What is Real Death?) তিনি উত্তর দিয়েছিলেন 'আত্ম-বিস্মৃতি' (Forgetfulness of the 'self')। নিজেকে ভুলে যাওয়া, নিজের পূর্ব ইতিহাস ভুলে যাওয়া; নিজের পরিবার, গোষ্ঠী, ধর্মের প্রতি নেমে আসা অসংখ্য আক্রমণের ধারাবাহিকতা ভুলে যাওয়ার নামই হল 'আত্ম-বিস্মৃতি'। বাঙালি হিন্দু হয়ে উঠেছে এক চরম আত্ম-বিস্মৃত জাত। তারা সহজেই তার উপর নেমে আসা প্রভূত-প্রহার ভুলে যায়; অপরিমিত অন্যায়-অত্যাচার বিস্মৃত হয়। ভুলে যায় বলেই তাদের ক্রমাগত পালিয়ে বাঁচতে হয় 'পূর্ব থেকে পশ্চিমে', আরও পশ্চিমে৷ দৌড় দৌড় দৌড়! জীবন হাতে করে পাশবিক পঙ্কিল পরিবেশে বাঁধা মুক্তির দৌড়! জলছবিটির মতো গ্রাম ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনের সন্ধানে নিজের ধর্ম নিয়ে দৌড়! মা-বোন-বউ-মেয়েকে মাংস-হাতড়ানো ভয়ঙ্কর পশুর মুখে ফেলে রেখেই নিজের জীবন বাঁচানোর দৌড়! এই আত্মবিস্মৃতি থেকে বাঙালি তখনই রেহাই পাবে, যখন যাবতীয় জীবনের জিঘাংসার সালতামামি ভুলতে দেবে না! সম্প্রীতির আলিঙ্গন নিয়ে বাস করেও প্রতিবেশীর আক্রমণের সহিংসতার ইতিহাস মনে রাখবে! বাঙালি হিন্দু টিঁকে থাকবে কিনা, তার পরীক্ষা তখনই শুরু হবে।
এখন এই জোর-জবরদস্তির জীবন থেকে মুক্তির পথ কোথায়? পলায়নপর হিন্দু বাঙালির মুক্তি ও শেষ গন্তব্য কোথায়? সে কী তার আপন ধর্ম-সংস্কৃতি বজায় রেখে, সন্তান-সন্ততি নিয়ে নিরুপদ্রবে বেঁচেবর্তে থাকতে পারবে না? পারবে। হিন্দুকে বেঁচে থাকতে হলে সংগঠিত হয়েই থাকতে হবে, প্রায় একশো বছর আগেই বলে গিয়েছিলেন ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা, হিন্দুরক্ষী স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ। বলেছিলেন "সঙ্ঘশক্তি কলিযুগে"। তিনি সঙ্ঘশক্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, কারণ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন বিশাল জাতিকে এক ধর্মসূত্রে গেঁথে নেবার প্রয়োজন আছে। তিনি হিন্দুকে মহামিলনে সম্মিলিত করাকে সেবা আখ্যা দিয়েছিলেন। হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকার। এই কাজে বাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিদ্বজ্জনের অংশগ্রহণ জরুরি, জরুরি ছাত্র ও যুবশক্তির অংশগ্রহণ, মাতৃশক্তির মহাজাগরণ। এরজন্য প্রত্যেকের মানসিক শক্তি চাই। শরীর সবল ও সুস্থ থাকলেই মানুষ মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হতে পারে। মানুষ ভয় পেলে আর শক্তিহীন হলে তোতাপাখির মতো শেখানো বুলি শুনিয়ে যায়। পেশীতে শক্তি না থাকলে সে অমেরুদণ্ডীর মতো আচরণ করে। তখন দু'-চারশো মানুষের জনশক্তিতে ভরপুর গ্রামেও আট দশজন হিংস্র মানুষের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে না। মনে রাখতে হবে হিন্দু বাঙালির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে এক দুষ্ট শক্তি, তাতে বাইরের দেশের বৃহত্তর মদত আছে। সেই পশুশক্তি প্রতিবেশীর রূপ ধারণ করে আমাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে এবং তারা ঐতিহাসিক কারণেই শক্তিমান। স্বামী প্রণবানন্দজীর মতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষা তখনই সম্ভব হবে, যখন উভয়েই শক্তিশালী ও মত প্রকাশে বলিষ্ঠ হবে। বারে বারে এমনই যোদ্ধা ও সন্ন্যাসীর সহাবস্থানই বোধহয় হিন্দু জাতির পতনকে রোধ করতে সক্ষম হবে৷ রামদাস-শিবাজির এই ঐক্যতান অবলোকন করাই হিন্দু সাম্রাজ্যের মূল সুর। এজন্যই আমরা ছত্রপতি মহারাজ শিবাজির জয়ধ্বনি করি।