আবারও কি পিছবো চূড়ান্ত তালিকা? নাকি, বঙ্গে এসআইআর-এর পর বাদ যাবে ১ কোটিরও বেশি নাম?
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, গণহারে ১ কোটিরও বেশি নাম বাদ গেলে রাজ্যের শাসক দল তো বটেই, কমিশনের বিরুদ্ধে পথে নামবে বাম-কংগ্রেসও। অন্যদিকে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দিন ফের পিছিয়ে গেলে, বঙ্গে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণাও পিছিয়ে যাবে। এবং, মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে ভোট ও গণনা পর্ব শেষ না-হলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন অনিবার্য হয়ে উঠবে।
'বাদে'র খাতায় কত?
খসড়া তালিকা প্রকাশ করার সময়ে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল: এই তালিকা দেখে নিশ্চিত হওয়ার কিছু নেই, শুনানির জন্য ডাকা হতে পারে অনেককেই। এবং সেই সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ৩১ লাখ ২৫ হাজার ভোটার আন-ম্যাপড। অর্থাৎ, ২০০২-এর সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা পাশাপাশি ফেলে বেশ কিছু অসংগতি দেখা যাচ্ছে এই সওয়া ৩১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে। এই অসংগতি নামের বানান নিয়ে হতে পারে। নিকটাত্মীয়ের নামের সঙ্গে মিল-অমিল নিয়েও হতে পারে। মা অথবা বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান নিয়ে। মিডিল-নেম থাকা বা না-থাকা নিয়েও। সর্বোপরি, একটি তালিকায় নাম থাকলেও অন্যটিতে নাম না-থাকা নিয়েও হতে পারে।
কমিশনের পরিভাষায় এই অংসগতিকে বলা হচ্ছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। এই অসংগতির কারণে অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামী, দেব, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, লাবণী সরকার, মহম্মদ শামি-সহ সওয়া ৩১ লাখ ভোটারকে শুনানির নোটিস ধরানো হয়েছে। হাইপ্রোফাইলদের ক্ষেত্রে সেভাবে সমস্যা না-হলেও, লোপ্রোফাইলদের নিদারুন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। খসড়া প্রকাশের দিন কমিশন জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের চোখে ১ কোটিরও বেশি ভোটার 'সন্দেহজনক'। তাঁদের নাম খসড়াতে থাকলেও কমিশন পুনর্যাচাই করে চলেছে। যদিও পুনর্যাচাইয়ের পর অনেক সন্দেহজনক নাম সন্দেহের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছেন। তবু, বাকি রয়েছেন প্রচুর ভোটার। যা প্রায় কোটির কাছাকাছি।
৫৮ + ৫০ = ১ কোটি ৮ লক্ষ বাদ?
খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। কমিশন জানিয়েছিল, কেউ যদি মনে করেন ভুলবশত তাঁর নাম বাদ পড়েছে, তাহলে নিয়মবিধি মেনে তিনি কমিশনের কাছে আবেদন করতে পারেন। এমতাবস্থায়, দু-দফায় শুনানি শুরু হয়। প্রথমে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে ২০২৫-এর তালিকা মিলিয়ে যাঁদের 'ম্যাপ' করা যায়নি, অর্থাৎ, যাঁরা 'আনম্যাপড' থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের একটা অংশ ও 'সন্দেহজনক' বহু ভোটারকে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়। তার কারণ, তাঁদের নামের পাশে 'প্রশ্নচিহ্ন' পড়ে গিয়েছে। এবং, শুনানি-পর্ব শেষের পর কমিশন-সূত্রে জানা যাচ্ছে, যাঁদের ডাকা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫০ লক্ষ নাম নিয়ে 'সন্দেহ' রয়েই যাচ্ছে। এবং, এখনও অর্ধকোটিরও বেশি নাম নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
বাদ না ফের পিছবো চূড়ান্ত তালিকা?
কমিশনসূত্রে খবর, একজনও বৈধ ভোটারের নাম যাতে বাদ না-যায়, তা নিয়ে তারা সতর্ক রয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে, একজনও 'সন্দেহভাজন' বা 'অবৈধ' ভোটারের নাম যাতে চূড়ান্ত তালিকায় না-থাকে, তা নিয়েও সমানভাবে সতর্ক কমিশন।
সমস্যা কোথায়?
কমিশন-সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুনানি-পর্বের পর কে বৈধ কে অবৈধ, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ইআরও এবং এইআরও। যাঁরা রাজ্যের অধীনে কর্মরত আধিকারিক। এবং মূলত এসডিও আর বিডিও পদমার্যাদার আধিকারিক। ৫০ লক্ষের বেশি নাম নিয়ে তাঁরা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাই, তার নিষ্পত্তিও হয়নি। এমতাবস্থায় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ২১ ফেব্রুয়ারি মধ্যে এই অর্ধকোটি নাম নিয়ে নির্বাচনী আধিকারিকরা সিদ্ধান্ত না-নিলে, ৭ দিনের মধ্যে ৫০ লক্ষের নাম নিয়ে নিষ্পত্তি করতে পারবে না কমিশন। এবং, 'চূড়ান্ত' যাচাইয়ের জন্য ফের পিছোবে চূ়ড়ান্ত তালিকা।
তাহলে কি রাষ্ট্রপতি শাসন?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৭ মে-র মধ্যে নতুন বিধানসভা গঠন করতে হবে। নইলে, দেশের সংসদীয় রাজনীতির স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারি অনিবার্য হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, হয় 'সন্দেহজনক' ভোটারদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে নয়তো বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো অবাঞ্ছিত পদক্ষেপ করা হবে। এবং, দুটোর যে কোনও একটাতেই লাভ হবে শাসকশিবিরের। 'সন্দেহজনক' নাম থেকে গেলে যেমন লাভ, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলেও তেমন লাভ। কারণ, সে ক্ষেত্রে 'শহিদ' হওয়ার সেন্টিমেন্ট তৃণমূলের কংগ্রেসের পালে প্রবল হাওয়া তুলবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।