বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে, বিস্তীর্ণ বঙ্গজুড়ে এসআইআর-এর শুনানি-পর্ব শেষ হয়েছে শনিবার। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, সবমিলিয়ে শুনানিতে এসেছিলেন দেড় কোটি মানুষ। যদিও, শুনানিতে হাজির হলেই যে চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকবে, এমনটা নয়। এমতাবস্থায়, কমিশন-সূত্রে খবর, নথি হিসেবে যাঁরা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৯৯ শতাংশের ডোমিসাইল কার্যত 'অবৈধ'। এবং সেই কারণে 'বাতিল'।
ডোমিসাইল বিতর্ক
সপ্তাহখানেক আগে জোর জল্পনা শুরু হয় ডোমিসাইল নিয়ে। এবং সেই জল্পনার পালে হাওয়া তোলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে লেখা জাতীয় নির্বাচন কমিশনের একটি চিঠি। সেই চিঠির অন্তর্নিহিত অর্থ না-বুঝেই দাবি করা হয়, কমিশন শেষ মুহূর্তে ডোমিসাইল সার্টিফিকেটকে বৈধ নথি হিসেবে মান্যতা দিল। যদিও বিষয়টা কিন্তু একেবারেই তেমন নয়।
কী লেখা রয়েছে চিঠিতে?
" Permanent Residential Certificate is one of the admissible eligibility documents under SIR guidelines dated 27.10.2025. Domicile / Permanent Residential Certificates in the State of West Bengal are issued in terms of West Bengal letter No 7482 (17)-P dated 02.11.1999 and order issued thereunder. In this context, I am directed to State that EROs/ AEROs, being the competent statutory authorities under the Representation of the People Act, 1950, shall accept only such Permanent Residential Certificates which are issued only by competent authorities namely by District Magistrate/ Additional District Magistrate/ Sub-Divisional Officer/ Collector (Kolkata), and strictly in accordance with the guidelines notified by the Government of West Bengal vide letter dated 02.11.1999 and subsequent orders issued thereunder."
সহজ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়: ২৭ অক্টোবর, ২০২৫-এ পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী ডোমিসাইল বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট অন্যতম বৈধ নথি। ভোটার তালিকায় নাম রাখতে অবশ্যই একে নথি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। শুধু তা-ই নয়। ২৭ অক্টোবর, ২০২৫-এ এসআইআর নির্দেশিকায় 'লিস্ট অব ইন্ডিকেটিভস ডকুমেন্টস'-এর ৬ নম্বরে লেখা রয়েছে: Permanent Residence certificate issued by competent State authority ( রাজ্য সরকারের যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষ দ্বারা ইস্যু করা পার্মানেন্ট রেসিডেন্স সার্টিফিকেট)। অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে এই 'ডোমিসাইল' গ্রহণযোগ্য।
সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হল, যে কোনও কর্তৃপক্ষ ডোমিসাইল ইস্যু করলে তা গ্রাহ্য হবে না। যে কারণে বিজেপি নেতাদের বলতে শোনা যাচ্ছে, কলকাতা পৌরসভা-সহ একাধিক পৌরসভার কাউন্সিলররা নাকি ডোমিসাইল সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে ঘুরছেন। এই দাবির সত্যতা আছে কি না, তার মধ্যে না-গিয়ে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাউন্সিলর বা পৌরসভা ডোমিসাইল ইস্যু করলে তাকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করবে না কমিশন। তাহলে কারা ডোমিসাইল ইস্যু করতে পারেন? কমিশনের সুস্পষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, জেলা শাসক, অতিরিক্ত জেলা শাসক, মহকুমা শাসক, ১৯৯৯ সালের ২ নভেম্বর রাজ্য সরকারের ইস্যু করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই মহার্ঘ্য ডোমিসাইল ইস্যু করতে পারবেন।
৯৯ শতাংশ ডোমিসাইল বাতিল?
সাত কোটির উপর ভোটার আর দেড়কোটির শুনানি, সবমিলিয়ে 'রাজ'সূয় যজ্ঞ শেষ হলো শনিবার। এবং শেষ পর্যন্ত এই দেড়কোটির মধ্যে কতজনের নাম চূ়ড়ান্ত তালিকায় থাকবে বা থাকবে না, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও, "নির্ভীক চিত্তে, কোনও পক্ষপাত না-করে"। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের কথায়, "উইদাউট ফিয়ার অ্যান্ড ফেভার"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুনানিতে ডাক পড়েছিল যাঁদের, তাঁদের একটা বড় অংশই নথি হিসেবে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। কমিশন সূত্রে খবর, যত ডোমিসাইল জমা পড়েছে, তার মধ্যে ৯৯ শতাংশই বাতিল হতে পারে। কারণ, প্রথমত কমিশন উল্লিখিত কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেনি ওই ডোমিসাইল। দ্বিতীয়ত, যাঁরা ডোমিসাইল জমা দিয়েছেন নথি হিসেবে, তাঁদের ডোমিসাইল পাওয়ার কথাই নয়!
তাহলে?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীতে যাঁরা কর্মরত তাঁরা এই সার্টিফিকেট পেতে পারেন। বর্তমানে যাঁরা সর্বভারতীয় স্তরে পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁরা পেতে পারেন। এবং ভিনরাজ্য থেকে বাংলায় এসে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন যাঁরা, তারা পেতে পারেন।
এমতাবস্থায় প্রশ্ন একটাই, শুনানিতে আসা দেড়কোটি মানুষের মধ্যে কতজনের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ যাবে ডোমিসাইল সংক্রান্ত কারণে?