সোমবার দিনভর রাজনৈতিক মহলের চর্চায় ছিল: নির্বাচন কমিশন। বঙ্গে এসআইআর-পর্বে দেশের অন্যতম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এই প্রথম তাদের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাতজন এইআরও-কে সাসপেন্ড করল। শুধু তা-ই নয়। রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এসআইআর শুরু হওয়ার আগে চারজন আধিকারিককে সাসপেন্ড করে তাঁদের নামে এফআইআর-এর যে-নির্দেশ দেয় কমিশন, তাঁদের সাসপেন্ড করা হলেও কেন এফআইআর করা হয়নি, তার জবাব চেয়ে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে দিল্লিতে ডেকে পাঠায় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এবং সেখানে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার মুখ্যসচিবকে কড়া বার্তা দিয়ে ওই চার আধিকারিকের নামে এফআইআর করার সময়সীমা বেঁধে দেন।
নন্দিনী চক্রবর্তী দিল্লি থেকে ফিরতে-না-ফিরতেই রবিবার রাতে কমিশন ৭ জন এইআরও-কে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দেয়। এবং কালক্ষেপ না-করে কমিশন সরাসরি ওই ৭ জনকে সাসপেন্ড করে। যা নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায় রাজ্য রাজনীতির মহলে।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, "এই প্রথম কমিশন তার নিজের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করলো। যে-সাতজন এইআরও-কে সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাঁরা জেনেশুনেই ভুয়ো স্কুল সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছেন, প্যান কার্ড গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের ১৩ টি নির্দেশিকা অমান্য করেছেন ওঁরা, মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর ইশারাতে। ওঁকে দিয়েই ব়্যাকেট চালাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। মনোজ পন্থ থেকে শুরু করে নন্দিনী চক্রবর্তী, কমিশন থেকে কোনও নির্দেশ এলে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীকে জানান আগে। তারপর তাঁর কথা মতো কাজ করেন। অন্যরাজ্যে এমনটা হয় না। এমনকি, লোকসভা নির্বাচনের আগে কমিশনের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীও হস্তক্ষেপ করেন না"।
এমতাবস্থায়, সাসপেন্ড হওয়া সাতজনের অন্যতম, ময়নাগুড়ির এইআরও ডালিয়া রায়চৌধুরী মন্তব্য সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এবং নেটপাড়ার নাগরিকরা ওই ভিডিয়ো দেখে মন্তব্য করেন: ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই যখন অনিয়ম করেছেন তিনি, তখন তার দায় কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
যদিও প্রশ্ন উঠছে, সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে ডালিয়া কি সত্যিই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন? এক কথায় এর উত্তর: না!
কী বলেছেন ডালিয়া? "কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো কাজ করেছি। এটুকু বলতে পারি। এর বেশি কিছু এই মুহূর্তে বলবো না"। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, যথাযথভাবে নথি যাচাই না-করেই তা আপলোড করেছেন আপনি, আপনি কী বলবেন? " আমার তরফ থেকে আমি একশো শতাংশ দিয়েছি। এর পর আমি আর কিছু বলবো না"। আপনাকে কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই নির্দেশ দিয়েছিলেন? " আমি করিইনি"। তাহলে আপনি যে বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই সবকিছু করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ডালিয়া স্পষ্ট জানান, "হ্যাঁ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সঠিক নির্দেশ দিয়েছে, সঠিক কাজই করেছি আমি"।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ময়নাগুড়ির সাসপেন্ড হওয়া এইআরও কিন্তু আদৌ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উপর দায় চাপাননি। প্রথমদিকে তাঁর কথায় কিছুটা স্ববিরোধ ছিল ঠিকই। সেই জন্য বুঝতেও একটু অসুবিধে হচ্ছিল, এ-ও ঠিক। তবে, পরে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, "হ্যাঁ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সঠিক নির্দেশ দিয়েছে, সঠিক কাজই করেছি আমি"। এবং সেইসঙ্গে তাঁর সংযোজন, "কেন সাসপেন্ড করা হয়েছে তা ওরাই (কমিশন) বলতে পারবে"।
রাজ্যের প্রশাসনিক মহলের একাংশ এর একটা যুতসই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। এবং তা হল, কমিশন সাসপেন্ড করার পর ডালিয়ার সার্ভিসবুকে যে 'দাগ' পড়লো, তা মুছে ফেলা সম্ভব নয় ঠিকই। কিন্তু, রাজ্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মুখ না-খুলে, কার্যত তাদের কাজ 'সঠিক' হয়েছে বলে দাবি করলে অদূর ভবিষ্যতে কিছুটা হলেও সুরাহা পেতে পারেন তিনি। এসআইআর ও ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পর যখন প্রশাসনের হাল ধরবে নবান্ন, তখন কিন্তু তাঁর বেতন, পদোন্নতি, শাস্তির মেয়াদ, অনেকটাই নির্ভর করবে রাজ্যের উপর। এবং সেই কারণেই এমন বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য তাঁর।