অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ওড়িশায় চব্বিশের বিধানসভা ভোটে নির্বাচন কমিশন তাঁকে ব্রহ্মপুর জেলার পুলিস সুপার পদ থেকে সরিয়ে দেয়। এবং, কমিশনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভোট সংক্রান্ত কোনও কাজেই ওই আইপিএস যুক্ত থাকতে পারবেন না। প্রসঙ্গত, সেইবারই ওড়িশায় নবীন পট্টনায়কের সরকার পরাজিত হয় ও বিজেপি সরকার গঠন করে।
ওড়িশা ক্যাডারের ২০১৫ সালের সেই আইপিএস সর্বনা বিবেক এম-কে এবার বিধানসভা ভোটে বাংলায় বিশেষ পুলিস পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হল। এবং সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠল, বিজেপি-শাসিত ওড়িশার এই আইপিএস কোন জাদুবলে মাত্র দু-বছরের মধ্যে চরম নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উতরে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন?
মৃত্যু পথযাত্রীকে বাঁচিয়ে শিরোনামে
নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সর্বনা ছোটবেলায় বাবাকে হারান। অনেক কষ্ট করে তাঁকে বড় করে তাঁর তোলেন স্কুল শিক্ষিকা মা। স্কুল শিক্ষার পর্ব শেষ করে মহাত্মা গান্ধী মেডিকেল কলেজ ও রিসার্চ ইনস্টিট্যুট থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। তারপর একদিকে মেডিকেল অফিসারে দায়িত্ব সামলানো আর অন্যদিকে আইপিএস হওয়ার প্রস্তুতি, দুই-ই চলতে থাকে। এবং, শেষ অবধি আইপিএস হওয়ার পরীক্ষায় উতরে যান তিনি।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে একটি ঘটনা ঘটে। এক জেলা থেকে অন্য এক জেলায় দু-ঘণ্টার যাত্রাপথে রাস্তায় একটি জটলা দেখে গাড়ি থামান আইপিএস সর্বনা। নেমে গিয়ে দেখেন, পথ দুর্ঘটনায় আহত তিন যুবক পথে পড়ে রয়েছেন। এবং, তাঁদের ঘিরেই এই জটলা। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা রীতিমতো আশঙ্কাজনক। বিবেকের কথায়, "আমি দেখলাম মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছেন ওই যুবক। সেখানে তখন রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। স্থানীয়রা অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে চুপ-চাপ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেখলাম, অ্যাম্বুল্যান্স আসতে-আসতেই মানুষটা মারা পড়বে। তাই আমি প্রথমে ফার্স্ট এইড করি, তারপর তিনজনকেই নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে হাসপাতাল অবধি যাই। শেষ অবধি প্রাণে বেঁচে যান গুরুতর আহত ওই যুবক। বাকি দুজনের আঘাত অত গুরুতর ছিল না"।
এই ঘটনায় সংবাদমাধ্যম তাঁর মানবিকতা নিয়ে প্রশংসা করলেও সর্বনার উত্তর, "আমি অতিরিক্ত কিছু করিনি, একজন সুনাগরিক হিসেবে আমার যা কর্তব্য তা-ই করেছি। দুর্ঘটনা ঘটলে লোকজন এগিয়ে আসে না একটাই কারণে, যদি আবার আইন-আদালত করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে, আমি একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম"। প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এখন আর দুর্ঘটনায় সাহায্যকারী কোনও ব্যক্তিতে পুলিসি ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয় না।
বিবেক মানবিক, কিন্তু নিরপেক্ষ কি?
মানবিক হলেও সর্বনা বিবেক-এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে। দু-বছর আগে যাঁকে নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় কমিশন, তাঁকেই কী করে একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে বিশেষ পুলিস পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়?
প্রাক্তন পুলিস কর্তাদের কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, ওড়িশায় সেবার সরকার বদলেছিল এবং বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল। বিধানসভা ভোটের আগে কমিশন তাঁকে অপসারিত করেছিল ঠিকই। তবে তার নেপথ্যে কি অন্য কিছু? বিজেপির ক্ষমতায় আসার বাধাহীন অবাধ পথে তাঁর সততাই কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কি?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর এখনই পাওয়া যাবে না। কারণ, সবে তো বিতর্ক শুরু হয়েছে। জল আর খানিকদূর গড়াক, তারপর যা বোঝার তা বোঝা যাবে।