Calcutta Television Network

হিন্দু পুরাণে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, এবং মহেশ

হিন্দু পুরাণে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, এবং মহেশ (শিব) হলেন ত্রিমূর্তি, যারা বিশ্বের সৃষ্টি, পালন, এবং ধ্বংসের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই ত্রিমূর্তি বিশ্বের চক্রাকার প্রক্রিয়ার প্রতীক: সৃষ্টি (ব্রহ্মা), পালন (বিষ্ণু), এবং ধ্বংস (শিব)।

এই তিন দেবতা হিন্দু দর্শনে বিশ্বের চক্রাকার প্রক্রিয়ার প্রতীক, যেখানে সৃষ্টি, রক্ষণাবেক্ষণ, এবং ধ্বংস একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই তিনটি প্রক্রিয়া একে অপরের পরিপূরক। হিন্দু দর্শনে ত্রিমূর্তিকে একই পরম সত্তার তিনটি রূপ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ব্রহ্ম (নিরাকার সত্তা) তাঁদের সকলের উৎস। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে (যেমন বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত) এই দেবতাদের মধ্যে একজনকে প্রধান হিসেবে গণ্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বৈষ্ণবরা বিষ্ণুকে এবং শৈবরা শিবকে সর্বোচ্চ মানেন।  ত্রিমূর্তির স্ত্রী—সরস্বতী, লক্ষ্মী, পার্বতী—ও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা শক্তি বা শক্তিস্বরূপা হিসেবে ত্রিমূর্তির কাজে সহায়তা করেন।

ব্রহ্মা হলেন বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা। তিনি সমস্ত জীব, প্রকৃতি, এবং বিশ্বের সৃষ্টি করেন। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, তিনি বিশ্বের শুরুতে নিজের থেকেই প্রকাশিত হন এবং সৃষ্টির কাজ শুরু করেন। প্রতীকীভাবে ব্রহ্মার চারটি মুখ, যা চারটি বেদ (ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ) এবং চারটি দিকের প্রতীক। চার হাতে তিনি বেদ, পদ্মফুল, জপমালা, এবং কমণ্ডলু (জলপাত্র) ধারণ করেন। তাঁর বাহন হলো হংস, যা জ্ঞান ও বিচক্ষণতার প্রতীক। তাঁর স্ত্রী সরস্বতী, জ্ঞান, শিক্ষা, এবং সঙ্গীতের দেবী।

পৌরাণিক মতে ব্রহ্মা বিষ্ণুর নাভি থেকে উৎপন্ন পদ্মফুল থেকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মনুষ্য, দেবতা, অসুর, এবং অন্যান্য প্রাণী সৃষ্টি করেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন মনু (মানবজাতির পূর্বপুরুষ) এবং সপ্তর্ষি (সাত ঋষি)।

ব্রহ্মা সৃষ্টির সৃজনশীল শক্তি এবং জ্ঞানের প্রতীক। তাঁর চার মুখ জ্ঞানের সর্বব্যাপীতা নির্দেশ করে।

বিষ্ণু বিশ্বের রক্ষাকর্তা। তিনি বিশ্বের শৃঙ্খলা, শান্তি, এবং ধর্ম রক্ষা করেন। অধর্ম বা অশান্তি যখন বৃদ্ধি পায়, তিনি অবতার হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন। প্রতীকীভাবে বিষ্ণু চার হাতে শঙ্খ (শব্দ ও শক্তির প্রতীক), চক্র (সুদর্শন, সময় ও ধ্বংসের প্রতীক), গদা (শক্তি), এবং পদ্ম (পবিত্রতা) ধারণ করেন। তিনি নীল বর্ণের, কারণ তিনি অনন্ত আকাশের প্রতীক। তাঁর বাহন গরুড়, শক্তি ও গতির প্রতীক। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী।

হিন্দু পূরাণে বর্ণিত বিষ্ণুর দশটি অবতার ( দশাবতার ) এর মধ্যে রয়েছে মৎস্য (মাছ), কূর্ম (কচ্ছপ), বরাহ (শুয়োর), নরসিংহ (মানুষ-সিংহ), বামন (বামন), পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ এবং ভবিষ্যৎ অবতার কল্কি, যিনি বর্তমান কলিযুগের অবসান ঘটাবেন।

 বিষ্ণু কূর্ম অবতারে সমুদ্রমন্থনের সময় মন্দর পর্বতকে ধরে রাখেন। রাম ও কৃষ্ণ হলেন তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় অবতার, যাঁরা যথাক্রমে রামায়ণ ও মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি শেষনাগের উপর ক্ষীরসাগরে শায়িত থাকেন, যা বিশ্বের স্থিতিশীলতার প্রতীক। 

বিষ্ণু করুণা, ধর্ম, এবং ভারসাম্যের প্রতীক। তাঁর অবতারগুলি বিশ্বের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের প্রতিনিধিত্ব করে।

শিব ধ্বংস ও পুনর্জননের দেবতা। তাঁর ধ্বংস সৃষ্টির জন্য পথ প্রশস্ত করে। তিনি যোগ, তপস্যা, এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। প্রতীকীভাবে তিনি ত্রিশূল (তিন শক্তির প্রতীক), ডমরু (সৃষ্টির শব্দ), এবং সাপ ধারণ করেন। তাঁর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা এবং মাথায় গঙ্গা ও চন্দ্র রয়েছে। তাঁর বাহন *নন্দী* (বলদ), যা ধর্ম ও শক্তির প্রতীক। তাঁর স্ত্রী *পার্বতী*, শক্তি ও প্রকৃতির দেবী। তাঁর সন্তান গণেশ ও কার্তিকেয়।

শিব হলেন নটরাজ, নৃত্যের মাধ্যমে সৃষ্টি ও ধ্বংসের প্রতীক। তিনি হলধর, যিনি সমুদ্রমন্থনের সময় উৎপন্ন হালাহল বিষ পান করেন। লিঙ্গরূপে শিব পূজিত হন, যা শক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক। তাঁর ত্রিশূল ও তৃতীয় নয়ন অজ্ঞানতা ধ্বংসের প্রতীক।

শিব পরিবর্তন, ত্যাগ, এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক। তিনি ধ্যান ও যোগের দেবতা হিসেবে মানুষকে মোক্ষের পথ দেখান।

শেয়ার করুন