শ্রী জগন্নাথ, যিনি ওড়িশার পুরী শহরে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরে পূজিত হন, হিন্দুধর্মের (বিশেষত বৈষ্ণব মতের) একটি গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। তাঁর আরাধনা প্রাচীন আদিবাসী সংস্কৃতি, বৈদিক অনুষঙ্গ এবং পুরাণের কাহিনিকে একত্রে মিশিয়ে এক গভীর এবং বহুস্তরীয় ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।
জগন্নাথকে বিষ্ণুর (বিশেষ করে কৃষ্ণের সর্বজনীন রূপের) এক অবতার হিসেবে গণ্য করা হয়। “জগন্নাথ” শব্দের অর্থ “বিশ্বের নাথ” (সংস্কৃত: জগত্ = বিশ্ব, নাথ = প্রভু)। তিনি তাঁর ভ্রাতা বলভদ্র (বলরাম) ও ভগ্নি সুভদ্রার সঙ্গে পূজিত হন—এই ত্রয়ী রূপটি জগন্নাথ সংস্কৃতিতে একেবারেই অনন্য।
স্কন্দ পুরাণ এবং অন্যান্য শাস্ত্রে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের মাধ্যমে জগন্নাথ উপাসনার উৎপত্তির কথা বলা হয়েছে। স্বপ্নে বিষ্ণু তাঁকে নির্দেশ দেন এক পবিত্র কাষ্ঠ (দারু ব্রহ্ম) খুঁজে বের করে তাতে প্রতিমা নির্মাণ করতে। দেবতাদের নির্দেশনায় তিনি সেটি পুরীর সমুদ্রতটে আবিষ্কার করেন। বিশ্বকর্মা বৃদ্ধ কারিগর রূপে এসে গোপনে মূর্তি নির্মাণ করতে রাজি হন। কিন্তু রাজা অস্থির হয়ে দরজা খুলে দিলে অসমাপ্ত অবয়ববিশিষ্ট প্রতিমাগুলি পাওয়া যায়। সেগুলিকেই ঈশ্বরীয় ইচ্ছা রূপে স্বীকার করে রাজা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। এই অপরিপূর্ণ, বিমূর্ত রূপই জগন্নাথের সর্বজনীন ও অতিনিরাকার রূপের প্রতীক।
প্রতি ১২ বা ১৯ বছর অন্তর ‘নবকলেবর’ নামক উৎসবে নব প্রতিমা নির্মিত হয় নির্দিষ্ট নীম কাঠ থেকে, যা ব্রহ্ম পদার্থ বহন করে বলে মনে করা হয়। এতে সাবরা (সৌরা) আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ জগন্নাথ উপাসনার আদিবাসী উৎসের ইঙ্গিত দেয়।
এক কাহিনী অনুসারে, কৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর হৃদয় (ব্রহ্ম পদার্থ) এক কাষ্ঠে সংরক্ষিত ছিল এবং সেটিই জগন্নাথ রূপে রূপান্তরিত হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার সম্পর্ক মাহাভারতের কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার মধ্যকার সম্পর্কের প্রতিফলন। রথযাত্রা উৎসব কৃষ্ণের গোকুল থেকে মথুরা বা বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
কয়েকটি কিংবদন্তি অনুসারে, জগন্নাথ পূর্বে আদিবুদ্ধ বা তান্ত্রিক দেবতা ছিলেন, পরে বৈষ্ণব ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হন। জৈন ধর্মের ঋষভনাথ ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবের কথাও বহু গবেষণায় উঠে এসেছে।
ওড়িশার আদিবাসী সাবরা বা সৌরা সম্প্রদায়ের কাঠের দেবতাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ উপাসনার সূচনা হয়েছে বলে গবেষকরা বিশ্বাস করেন। পরবর্তীতে পুরাণ, মহাভারত ও গীতা গোবিন্দে পুরীকে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং জগন্নাথকে বিষ্ণু/কৃষ্ণের রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
১২শ শতকে রাজা চোড়গঙ্গ দেব বর্তমান জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেন। পরবর্তী রাজারা নিজেদের ‘সেবক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মন্দির ও রথযাত্রাকে বৃহৎ জনউৎসবে পরিণত করেন।
১২শ থেকে ১৬শ শতকে রামানন্দ, চৈতন্য মহাপ্রভু ও জয়দেবের মতো ভক্তরা জগন্নাথের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন। বিশেষত চৈতন্যদেবের উন্মাদনা পূর্ণ ভজন ও নৃত্য রথযাত্রাকে সর্বভারতীয় উৎসবে পরিণত করে।
ব্রিটিশরা রথযাত্রার বিশাল রথ দেখে “Juggernaut” শব্দটির উদ্ভব ঘটায়। স্বাধীনতার পর, মন্দির সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে—ঐতিহ্য বজায় রেখে আধুনিক ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে।
জগন্নাথের রূপ জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত। আদিবাসী দাইতাপতি পুরোহিতগণ এখনও গুরুত্বপূর্ণ আচার পালন করেন—বিশেষ করে নবকলেবরে। রথযাত্রায় জগন্নাথের মন্দির ত্যাগ করে জনগণের কাছে আসা ঈশ্বরের বিনম্রতা ও সর্বজনীনতার প্রতীক।