Calcutta Television Network

একটি জাহাজডুবি ও মর্মান্তিক ইতিহাস

একটি জাহাজডুবি ও মর্মান্তিক ইতিহাস
13 October 2026 05:57:09 pm

হাওড়া ব্রিজ। নিচে ব্যস্ত ফুলের বাজার। সারাদিন চেঁচামেচি লেগেই থাকে। চলে লেনদেন। চক্ররেলের লাইন বেয়ে মাঝেমাঝে ঝমাঝম রেলগাড়ি পাড়ি দেয় সুদূর কোনও স্টেশন। কিন্তু এই ফুলবাজারের কাছে নীরবে অবস্থান করছে একটি ঘাট। ছটলাল-দুর্গাপ্রসাদ ঘাট। তেমন ব্যবহার হয় না ঘাটটা। সিঁড়ির এক কোণে নিত্য যাত্রীর ভিড় টপকে পৌঁছে গেলে লক্ষ্য করা যায় আবছা একটি ফলক। সকলের অলক্ষ্যে পড়ে আছে। ঝাপসা অক্ষরে লেখা কিছু নাম।

এটি একটি যাত্রী স্মারক। বাঙালির অবসরযাপনের গন্তব্য দীপুদা। সেই প্রাচীন কাল থেকে। ‘দী’ ও ‘দা’ তো নয় পৌঁছনোর ভিন্ন পথ, কিন্তু পুরী পৌঁছতে স্থলপথ দুর্গম। জলপথে কটক হয়ে পুরী পৌঁছতে ভরসা পালকি। যা যথেষ্ট কষ্টকর। বাঙালির তীর্থ করতে যাওয়ার হিড়িক দেখে ব্রিটিশ সাহেব ফন্দি আঁটলো বিকল্প জলপথের। সমুদ্রপথে বালেশ্বর হয়ে পুরী। তেমনই একটি জাহাজ কোম্পানি, নাম ‘ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানি’। বিজ্ঞাপন পড়লো ইংলিশম্যান কাগজে। বুক ফুলিয়ে আত্মপ্রচার সেরে ফেললো তারা। এমনই এক গ্রীষ্ম। সালটা ১৮৮৭। যাত্রী নিয়ে পাড়ি দিল পুরীর উদ্দেশ্যে। প্রবল ঝঞ্ঝায় ৭৫০ জন যাত্রী নিয়ে নিমজ্জিত হল বঙ্গপোসাগরে। তাও আবার তাঁদের কোম্পানির খ্যাতনামা জাহাজ ‘সার জন লরেন্স’। যাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মহিলা।  

প্রতিদিনই এই পথে ছিল দুর্যোগের সতর্কবার্তা। কিন্তু সেই আশঙ্কাকে কার্যত উপেক্ষা করেই রাতের অন্ধকারে কলকাতার কয়লাঘাট থেকে যাত্রা শুরু করেছিল বাষ্পীয় জাহাজটি। তারপর থেকেই প্রতীক্ষার প্রহর দীর্ঘতর হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সে আর ফেরেনি। উদ্বেগ বাড়ল, জড়ো হলেন বহু মানুষ। কিন্তু জাহাজ কোম্পানি ম্যাকালিনের দাবি, ক্যাপ্টেন আরভিংয়ের মতো সাহসী নাবিকের নেতৃত্বে থাকা জাহাজের ‘কোনোকিছুই হতে পারে না’।

২৭মে চাঁদবালির স্টিমার অফিস থেকে একটি টেলিগ্রাম এসে পৌঁছলো। জানানো হল, ‘সার জন লরেন্স’ এখনও সেখানে পৌঁছয়নি। তবু টনক নড়ল না কোম্পানির। নিখোঁজ জাহাজের পরবর্তী যাত্রার বিজ্ঞাপনও প্রকাশিত হয়ে গেল। কেটে গেল আরও বেশ কিছু দিন। অবশেষে ১৮৮৭ সালের ২ জুন ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বুঝিয়ে দিল, অপেক্ষা অর্থহীন। কলকাতায় ফেরার পথে ‘রেসলিউট’ নামে একটি জাহাজ সাগরের মোহনায় একাধিক ভাসমান মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করে। মুহূর্তে শোক ও আতঙ্কে তোলপাড় হয়ে ওঠে শহর। এই মর্মান্তিক ঘটনা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও আলোড়িত করেছিল। তিনি রচনা করেন ‘সিন্ধুতরঙ্গ’ কবিতা। কিন্তু বিপর্যয়ের পরেও জাহাজ কোম্পানির তরফে শোকপ্রকাশের বদলে বিজ্ঞাপন প্রকাশের প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এই আচরণে ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হয়েছিলেন একদল ইংরেজ মহিলাও। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো তীর্থযাত্রীদের স্মৃতির উদ্দেশে কলকাতার গঙ্গার ঘাটে তখন স্থাপিত হয় একটি পাথরের ফলক। সময়ের প্রবাহে ফলকের পাথর বিবর্ণ হয়েছে, অক্ষরগুলিও হারাতে বসেছে স্পষ্টতা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঘাটের পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন, গঙ্গায় স্নান করতে আসেন। তাঁদের ব্যস্ততার মধ্যে কতজনই বা থমকে দাঁড়ান এই স্মৃতিচিহ্নের সামনে?

×
  • CTVN