Calcutta Television Network

প্ৰখ্যাত লেখক চার্লস ডিকেন্সের পুত্রের সমাধি কলকাতায়?

প্ৰখ্যাত লেখক চার্লস ডিকেন্সের পুত্রের সমাধি কলকাতায়?
15 October 2026 05:31:29 pm

কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট সমাধিক্ষেত্র। ছড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের নানা ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিদেশী সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক চার্লস ডিকেন্সের পরিবারের এক করুণ অধ্যায়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ওয়াল্টার ল্যান্ডার ডিকেন্সের শেষ ঠিকানা ছিল এই শহর। যখন তার মাত্র ২২ বছর বয়স, এ শহরেই মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু কেন সুদূর ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতে এসেছিলেন ডিকেন্সপুত্র? চার্লস ডিকেন্সের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘অলিভার টুইস্ট’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এবং ‘আ টেল অব টু সিটিজ’-এর মতো সব বিখ্যাত উপন্যাস। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সমাজের বিচিত্র ছবি। তবে লেখকের নিজের পরিবারের সঙ্গে কলকাতার যে এমন বিষাদমাখা কাঠিন্য তৈরি হবে, তা হয়তো কোনোদিন কল্পনাও করেননি তিনি।


ঊনবিংশ শতকের ভারতবর্ষ। তখনও ভারতীয় উপমহাদেশের মাটিতে পতপত করে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। হঠাৎই, ১৮৫৭ সালে একদিন সিপাহি বিদ্রোহ ঘটে গেল দেশব্যাপী, তারপর ভারতে ব্রিটিশ সেনা নিজেদের উপস্থিতি ক্রমে আরও দৃঢ় করে তোলে ও সেনাছাউনি বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ভারতে আগমন ঘটেছিল ওয়াল্টারের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে তাঁর নিয়োগ হয়। কলকাতা ছিল ব্রিটিশ সেনাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। ইংল্যান্ড থেকে আসা সেনাদের অনেককেই প্রথমে আগে এই শহরে বসবাস করতে দেওয়া হত। পরে তাঁদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রেরণ করা হত।

তবে ভারতে এসে বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারেননি ওয়াল্টার। শারীরিক অসুস্থতা ক্রমে বৃদ্ধি পায়। তারপর হঠাৎই একদিন রক্তবমি শুরু হওয়ায় তাঁকে সেনাবাহিনীর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসা করেও শেষরক্ষা হয়নি। ১৮৬৩ সালে কলকাতায় মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। ভবানীপুরের একটি সামরিক সমাধিক্ষেত্রে তখন তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিস্মৃতির আড়ালেই থেকে গেছে এই ঘটনা। পরে ১৯১১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয় একটি প্রতিবেদন, যা নতুন করে জল্পনা উস্কে দেয়। সেই প্রতিবেদনে চার্লস ডিকেন্সের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া পুত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর ফলে কলকাতায় তাঁর সমাধি থাকার বিষয়টিও তখন সাধারণ মানুষের নজরে আসে।


কিন্তু ভবানীপুর থেকে ওয়াল্টারের সমাধি সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেটারিতে এল কী ভাবে? জানা যায়, পুরনো সামরিক সমাধিক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৮৭ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ওয়াল্টারের সমাধি সাউথ পার্ক স্ট্রিট সমাধিক্ষেত্রে স্থানান্তরিত করেন। সেখানেই রয়েছে তাঁর বর্তমান স্মৃতিচিহ্নটি।  সময়ের সঙ্গে সমাধির চেহারায় লেগেছে অবহেলার ছাপ। নামের লেখাও মুছে গিয়েছে অনেকখানি। ভেঙে যাওয়া স্তম্ভের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও কী ভাবে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয় সময়ের চোরাস্রোতে কবলে।

ছেলের মৃত্যুর খবর চার্লস ডিকেন্সকে গভীর ভাবে আঘাত করেছিল। পুত্রকে উদ্দেশ্য করে লেখা তাঁর একটি চিঠিতেও কলকাতার প্রসঙ্গ উদ্ধৃত হয়। যে তরুণের সামনে তখনও পড়ে ছিল দীর্ঘ জীবন, তাঁর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! শুধু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে জুড়ে গেল এই শহরের নাম। আজ সাউথ পার্কস্ট্রিট সমাধিক্ষেত্রে ওয়াল্টারের সমাধি মনে করিয়ে দেয়, এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে কত দূরের কিছু মানুষের জীবনও অদ্ভুতভাবে মিশে রয়েছে।

×
  • CTVN