Calcutta Television Network

দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তায় কাজে ফাঁকি মেরেছিলেন কে?

দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তায় কাজে ফাঁকি মেরেছিলেন কে?
14 October 2026 04:03:59 pm

শহরের খ্যাতনামা জমিদার বাড়ি। দর্জিপাড়ার মিত্র পরিবার। বিডন স্ট্রিট জুড়ে মিত্রপরিবারের বসতি। যদিও তাঁদের আদিবাস অন্যত্র, বরিষা গ্রাম। সেখান থেকে প্রথমে বসতি কোন্নগর, তারপর আড়িয়াদহ। একদম শেষ সময়ে অবশেষে সুতানুটিতে এসে জগন্নাথপ্রসাদ মিত্রর নিবাস স্থাপন। এই জগন্নাথ প্রসাদেরই পৌত্র ছিলেন দুর্গাচরণ মিত্র। তাঁর জীবৎকালেই নবাবি শাসনের পতন ঘটে বাংলায়। সাহেবদের ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি জাঁকিয়ে বসে বাংলার মসনদে। তমলুকে তাঁর ছিল নুনের দেওয়ানি। সাবেক দর্জিপাড়ায় যেখানে তিনি বাস করতেন আজ সেখানেই বিডন রো। এগারো বিঘা জমি, চারটি পুকুরসহ বিশাল প্রতিপত্তি তাঁর। তাঁর সেরেস্তাতেই মুহুরির কাজে নিযুক্ত ছিলেন এক ব্যক্তি। যাকে নিয়েই পড়লো হৈচৈ। কারণ?

দুর্গাচরণ মিত্রর সেরেস্তায় যাঁরা কাজ করেই, তারা কেউই বিশেষ পছন্দ করেন না এই মুহুরীকে। কোথাকার কোন লোক, ভবঘুরে গোছের। কথায়বার্তায় খালি আধ্যাত্মবাদের রোজনামচা। তাঁর বলা অনেক কথা বুঝেও উঠতে পারেন না তারা। আড়ালে আবডালে পাগল বলেও বিদ্রুপ করে দেন মাঝেসাঝে। তবু তাঁর প্রতি উপরমহলের সুনজর অনেকে বাঁকা চোখে দেখে। ফাঁক খোঁজে কিছু সুযোগসন্ধানী। পেয়েও যায় একদিন।

সকাল থেকে চাপা স্বরে আলোচ্য বিষয়, ওই মুহুরীর শাস্তি কী হতে পারে? নায়েব, কর্মচারী যদি ছেড়েও দিই হেঁসেলের চাকরবাকররা পর্যন্ত কানাকানি করছে। এবার নিশ্চিত চাকরি যেতে চলেছে। অনেকে বহু কান ভাঙানোর চেষ্টাও করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। এবার একেবারে হাতেনাতে। বাবুর কাজে ফাঁকি! সোজা খবর পৌঁছলো দুর্গাচরণের দপ্তরে। যাকে নিয়ে এতো আলোচনা সে একা এক কোণে বসে আছে অপরাধীর মত। বাবু এলেন। সামনে খুলে দেওয়া হলো হিসাবের খাতা। গম্ভীর মুখে দেখতে শুরু করলেন বাবু। খাতা পড়তে পড়তে মুখ আরও গম্ভীর হয়ে যায় তাঁর। তাহলে অভিযোগ সত্যি। কাজে এভাবে ফাঁকি! ভুরু কুঁচকে যায় তাঁর। ক্রুদ্ধ দুর্গাচরণ সবে কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় চোখ আটকে গেল একটি বিশেষ পংক্তিতে। সারা পাতা জুড়ে অসংখ্য গানের মধ্যে উল্লিখিত কটি লাইন। 

‘আমায় দে মা তবিলদারি।

আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী।।

পদরত্ন ভান্ডার সবাই লুটে, ইহা আমি সইতে নারি।

ভাঁড়ার জিম্মা যার কাছে মা, সে যে ভোলা ত্রিপুরারি।'

‘অভিযুক্ত’ ব্যক্তির নাম রামপ্রসাদ। সাধক রামপ্রসাদ সেন। হালিশহরের সাবেক বাসিন্দা। কালী উপাসক। দুর্গাচরণ মুগ্ধ হয়ে বারবার পড়তে থাকেন। কী অদ্ভুত লেখা! তিনি নবাব সিরাজের দপ্তরে জহুরি ছিলেন। জহুরির চোখ চিনে নেয় রামপ্রসাদকে। সেদিন চাকরি যায়নি তাঁর। বরং তিরিশ টাকা মাসিক ভাতায় গান লেখার কাজ বরাদ্দ হয়। কবিত্ব সাধনায় নূন্যতম বিচ্যুতি না ঘটে, তাই এই ব্যবস্থা দুর্গাচরণের। বাংলার  সংস্কৃতিতে, জলে, হাওয়ায় ও মাতৃসাধনায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জুড়ে গেলেন সাধক রামপ্রসাদ। আর সেই জমিদার, আজ সামনের রাস্তাটি তাঁর নামে নামাঙ্কিত।

×
  • CTVN