Calcutta Television Network

প্যারোডি গান কি হারিয়ে গেল

প্যারোডি গান কি হারিয়ে গেল
7 June 2024 • 02:25:47 pm

প্যারোডি গান সম্রাট মিন্টু দাসগুপ্তের গলায় বিষাদের সুর, ‘আমাদের গান শেষ হয়ে গেল।’ একসময় প্যারোডি গানে দর্শক মাতিয়ে রেখেছিলেন মিন্টু দাশগুপ্ত, দীপেন মুখার্জী, রঞ্জিত রায়, অমল চ্যাটার্জীর মতো গুনী শিল্পীরা। মিন্টু দাশগুপ্তের কথার যে আক্ষেপ ভুল নয় তা আজকের সঙ্গীত জগতের দিকে তাকালে মর্মে মর্মে টের পাওয়া যায়। নতুন প্রজন্ম এই ধরনের গানের ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই।

প্যারোডি গান মিন্টুবাবুর হাত ধরে আসেনি। ওনার মতে এ ধরনের গানের স্রষ্ঠা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু হাসির গান শুনেছেন। কাজী নজরুলও পিছিয়ে নেই। ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত গান ভেবে লেখেন নি। লিখেছেন কবিতা। সেই কবিতায় দুর্দান্ত সুরের মায়াজালে শিল্পী সনৎ সিংহের গাওয়ার শুনে গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্যারোডি গানের আলোচনা করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে রবীন্দ্রনাথের রচনাতেই। রবীন্দ্রসংগীতের প্যারোডি করেন স্বয়ং কাজী নজরুল। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের আদলে একটি গান লেখেন। জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ‘আমায় ক্ষমা হে, নমো হে নমো’র অনুকরনে নজরুল লেখেন, ‘একবার নাম হে নাম’। নজরুলের বাড়িতে প্রায়ই গানের আড্ডা বসতো। সেই আড্ডায় রঞ্জিত রায়ও থাকতেন। তিনি একাধারে গায়ক ও অভিনেতা। গান গাইলেও মূলত তিনি হাসির গানের শিল্পী। একবার ‘নাম হে নাম’ গানটি শুনে তিনি ঠিক করেন গানটি রেকর্ড করবেন। করলেনও। এখন প্রকাশ করবেন কিভাবে! রবীন্দ্র গানের অনুকরন যেহেতু তাই রবিঠাকুরের অনুমতির প্রয়োজন। ঠিক হলো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে যাওয়ার। রঞ্জিতবাবু সেদিন এইচ.এম.ভি. র রিজিওন্যাল ম্যানেজার হেমচন্দ্র সোমকে সঙ্গে নিলেন। যথারীতি ঠাকুর বাড়িতে প্রনাম পর্ব ও আলাপ পর্ব শেষে রঞ্জিতবাবু আসল কারনটা নিবেদন করলেন বিনম্রভাবে। ‘দেখুন কাজী নজরুল একটা অন্যায় করে ফেলেছেন। আপনার একটা গানের অনুকরনে, একটা গান লিখে ফেলেছেন। সেটা হাসির গান। কিন্তু এসব থেকে আরো একটা অন্যায় করে ফেলেছি আমি নিজে। আমি গানটি রেকর্ড করে ফেলেছি। অন্যায় জেনেও গানটি শোনার জন্য অনুরোধ করছি। যদি মনে করেন তাহলে অনুমোদন দেবেন।’ 

রবীন্দ্রনাথ গানটি চালাতে বললেন। কবির শুনতে শুনতে কৌতুক প্রকাশ হলো। দুবার শুনলেন গানটি। তারপর কবি বললেন, “অনুমতি দিতে পারি একটা শর্তে। আমাকে তিনটে রেকর্ড দিতে হবে।’’ কথা শুনে আমরা শব্দ করে হেসে উঠলাম। এভাবেই জন্ম হলো প্যারোডি গানের। যাত্রা শুরু হলো সেই তখনই। এরপর এই কাজে এগিয়ে আসেন তৎকালীন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক এবং সতীশ ঘটক রবীন্দ্রনাথের একটি গান, “তুমি কেমন করে গান করো হে গুনী’’ , এই গানের অনুকরনে তিনি লেখেন, “তুমি কেমন করে পান করে হে চুনি’’ আর কুমুদরঞ্জন মল্লিক লিখে ফেললেন, “সে যে কাজে এসে’’ এই গানের অনুকরনে লেখেন “আমার পাকার যখন কথা ছিল’’, কিন্তু দুজনের কারো অনুমতি পাওয়া হলো না- কারন গুরুদেব প্রয়াত হয়ে গেছিলেন।

মিন্টু দাশগুপ্ত ও দীপেন মুখোপাধ্যায় দুজনেই আক্ষেপ করে বলেন, বিচিত্রানুষ্ঠানের স্বাদ বদলানোর জন্য থাকতো প্যারোডি গান, আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, হাস্যকৌতুক, মূকাভিনয় ইত্যাদি। কিন্তু হঠাৎ করেই এসব হারিয়ে গেল। লক্ষ্য করে দেখুন জীবনমুখী ব্যান্ডের নাম যেসব গান ইচ্ছে তার অনেক গুলোই প্যারোডি।

সবশেষে বলতে হয়, বর্তমানে হাসি জীবন থেকে উঠে গেছে বলা যায়। সেখানে যদি প্যারোডি গানে হাসির মোড়কে জীবন যন্ত্রনার কথা তুলে ধরা যায় তাতে ভালো ছাড়া খারাপ কোথায়! আশা করছি - আবার যেন বাজারে প্যারোডি গান রমরমিয়ে ওঠে। তথ্যঋণ-দীপক বন্দোপাধ্যায়।