কোচবিহারের গ্রামবাংলার সঙ্গে মনসা পুজোর সম্পর্ক চিরন্তন। পুজোর বিবিধ উপকরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে মনসা পট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই লোকশিল্পের চাহিদা ক্রমে কমেছে। শুধুই বেড়েছে শিল্পীদের আর্থিক সমস্যা। তার মধ্যেও বংশের পুরনো শিল্পরীতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছেন কোচবিহারের ভেটাগুড়ি বালাডাঙ্গা গ্রামের মালাকার সম্প্রদায়ের শিল্পীরা। এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে শোলার উপর মনসার পট তৈরির রীতিরেওয়াজ বিদ্যমান। স্থানীয় শিল্পীদের বক্তব্য, একসময় শোলার উপরেই আঁকা হত পট। কিন্তু শোলার দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তুলনামূলক কম খরচের কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রামের প্রায় দশটি পরিবার এখনও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। মালাকারদের পাশাপাশি বর্মণ পদবির একাধিক পরিবারও বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখানকার মানুষের তৈরি পট কোচবিহারের পাশাপাশি শিলিগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং অসমেও যায়।
মনসা পটের পাশাপাশি বানানো হয় শোলা দিয়ে কালিমুখ, মাসান ঠাকুর, টোপর, দেবদেবীর অলঙ্কার এবং নানা ধরনের ফুল। এখানকার পরিবারগুলোতেও মনসার ডেলা পুজোর প্রচলন রয়েছে। সেখানে বিষহরি, কানি বিষহরি-সহ বিভিন্ন পট এবং শোলা দিয়ে তৈরি গোদা-গুদি ও দুই সেপাইয়ের মূর্তি রাখা হয়। কোনও ছাঁচ ছাড়াই হাতে তৈরি হয় এই মূর্তিগুলি। শোলা সংগ্রহ করা হয় ভেটাগুড়ি বাজারের সিংহীজানি এলাকা থেকে। বিশেষ ধারালো ‘কাইত’ দিয়ে শোলা কেটে আস্তেআস্তে পাতলা করা হয়। পরে তার উপর রং দিয়ে আঁকা হয় দেবদেবীর ছবি। এই কাজে দক্ষতা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এই পেশায় থাকতে চাইছেন না। তৈরী পটগুলি পৌঁছে যায় কোচবিহার, ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি কিংবা কালিয়াগঞ্জ। কোচবিহারে বিষহরি পটের চাহিদা বেশি। অন্য দিকে পাবনা ও ময়মনসিংহ থেকে আসা পরিবারগুলির মধ্যে করণ্ডির পুজোর প্রচলন রয়েছে। এই এলাকার বহু মালাকার পরিবারের শিকড় পূর্ববঙ্গের রংপুরে। কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরের শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসা পুজোর জন্যও এই এলাকার শিল্পীরাই পট তৈরি করেন। মন্দিরের জন্য তৈরি পটের উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিন ফুট থেকে সাড়ে সাত ফুট পর্যন্ত হয়। ভেটাগুড়ির মনসা পটের মধ্যে বিষহরি পট বিশেষভাবে পরিচিত। ত্রিভুজের মতো আকৃতির এই পটের মাঝখানে থাকেন মা মনসা। লাল শাড়ি পরা দেবীকে পদ্মের উপর স্থান দেওয়া হয়। মাথার উপরে থাকে শিবের প্রতিকৃতি। দু’পাশে থাকে হাঁস এবং দেবীর হাতে থাকে সাপ। পটের উপরের অংশে শোলার তৈরি সাপও বসানো হয়। স্থানীয় শিল্পীদের কাছে এই পট ‘পদ্মা পট’ নামেও পরিচিত। সারা বছরই এর বিপুল চাহিদা রয়েছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য ধরন হল কানি বিষহরি পট। এখানে মনসার মুখ পাশ ফিরে থাকা অবস্থায় অঙ্কিত হয়। ঘোমটা দেওয়া বধূর মতো দেবীর হস্তে বিরাজমান পদ্ম। মাথার কাছে থাকে ফণা তোলা সাপ। শিল্পীদের তুলির কাজে দেবীর মুখে শান্ত ও গম্ভীর ভাব ফুটে ওঠে। এছাড়া রয়েছে সাধারণ ‘মনসার পট’ বা ‘পটি’। এর উপরের অংশ অনেকটা চালির মতো গোল। নিচের দিকে দেখা যায় চাঁদ সওদাগর এবং তাঁর সঙ্গীদের বাণিজ্যতরী। অন্য দিকে মৃত লখিন্দরকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রার্থনা করছেন বেহুলা। মাঝখানে পদ্মফুলের উপর অবস্থান করেন মা মনসা। তাঁকে ঘিরে থাকে অষ্টনাগ। মাথার উপরে থাকে শিবের প্রতিকৃতি। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে এই পট পুজো হয় ঘরে ঘরে।
মনসা পটের পাশাপাশি এই এলাকায় শোলার কালিমুখা তৈরিরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পৌষ মাসে নতুন ধান ওঠার পর কালিমুখা পরে নাচের একটি লোকাচার রয়েছে। বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সেই নাচ দেখিয়ে মাগন করার রীতি চলে চড়ক অবধি। এভাবেই বেঁচে প্রাচীন বাংলার রীতি। কোথাও খানিক ধুঁকছে, কোথাও আবার ঋতু বৈচিত্রে আসছে বায়না। কিন্তু টিমটিম করে জ্বলে রয়েছে গ্রামবাংলার কুটিরশিল্প।