কলকাতা তখনও ব্রিটিশ শাসনাধীন। তবু বাঙালির মিষ্টিপ্রেম অমর, অক্ষয়, শাশ্বত। সুতানুটি জুড়ে সাধারণ মানুষের বসতি বাড়ছে। নিজের গা থেকে সে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে গেয়ো তকমা। আদি লোকেরা নন, বাইরে থেকে আসছে মানুষ। কিনছে জমি। তেমনই বেশ কিছু মানুষ ঘাঁটি গাড়ছে চিৎপুরের আশেপাশে। আর বাঙালি থাকলে চাহিদা বাড়বে মিষ্টান্নর। কিছু মোদকও এসে থাকতে শুরু করলো এই চত্বরে। বনেদি জমিদার বাড়ি গুলোয় লেগেই থাকতো উৎসবের আতিসজ্য। আর উৎসব মাত্রই মোদকের মিষ্টান্নর বুলাও। ভোজন আয়োজনে ঢালাও ভিয়েন বসতো তখন।
১৮৫৪-তে শুরু হয়ে গেছে রেলগাড়ি। তাই বর্ধমান-হুগলি ও অন্যান্য গ্রাম থেকেও এসে পৌঁছচ্ছে মিষ্টির সম্ভার। কালনায় বিখ্যাত খানা, বহরমপুরের ছানাবড়া, হিমসাগর, পোলাও সন্দেশ, বেলডাঙার মনোহরা, কৃষ্ণনগরের সরভাজা কিংবা সরপুরিয়া তো রাজবাড়ীতেও প্রসিদ্ধ ছিল। যত সময় এগোয়, মিষ্টিতে বাড়ে বৈচিত্রতা। ছোঁয়া লাগে অভিনবত্বের।
তেমনই বাংলার মিষ্টান্ন চর্চায় অন্য মাত্রা জুড়ে দিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দাস। যদিও বাঙালি আজ তাঁকে কে সি দাস নামেই চেনে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী। আদ্যপান্ত বিজ্ঞান অনুরাগী মানুষ। পড়াশোনা করতেন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে। যদিও তাঁর পিতা নবীনচন্দ্র দাস অসুস্থ হওয়ায় শেষ করতে পারেননি পড়াশোনা। তারপরেও বিজ্ঞানচর্চায় কিন্তু ভাঁটা পড়েনি। জোড়াসাঁকোয় কে সি দাসের নতুন মিষ্টির দোকানে সাইনবোর্ড, ‘হাইজিনিক কনফেকশনারি’! তিনি লক্ষ্য করেছিলেন কোথায় পরিচ্ছন্নতার অভাব হচ্ছে। বিলিতি সুইট পেস্ট্রি সাহেবরা জনপ্রিয় করছেন শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতার দোহাই দিয়ে। তাঁরই বিজ্ঞান সাধনার প্রয়াস পথ দেখালো বাঙালিকে। ময়রারা মিষ্টি তোলার জন্য পেল চিমটে। সাথে সুন্দর প্যাকেজিং। সেই বিজ্ঞানযাত্রার প্রমান আজও পাওয়া যায় তাঁর দোকানে গেলে। ক্ষয়ে যাওয়া সেই পুরোনো লেখাগুলো জ্বলজ্বল করছে। ইংরেজিতে লেখা ‘Hygienic’ তিন ভাষাতেই লেখা। সাথে জুড়ে গেল মিষ্টির বদলে যাওয়া দিনকাল। সময়ের পরত পড়লো বিস্তর। কিন্তু বঙ্গজীবনে মিষ্টিসুখ ও স্বাস্থ্যর সমান্তরাল যাত্রাও শুরু হলো এখান থেকেই, যা আজও চলছে সমান ঐতিহ্য নিয়ে!