Calcutta Television Network

কলকাতার সিনেমাহল ও কবিগুরু

কলকাতার সিনেমাহল ও কবিগুরু
9 October 2026 • 05:41:10 pm

ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে কলকাতা। বদলাচ্ছে নাগরিক জীবন, বদলাচ্ছে বিনোদনের ধরন। বাংলা সাহিত্যেও ধরা পড়ছে নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতার ছাপ। ঈশ্বর প্রভারাণী গুপ্তার অপ্রকাশিত ‘আসমানি তারা’ কাব্যের ‘ফুল্ল নলিনী’ ও ‘নয়ন তারা’র টেলিফোনে কথোপকথন তারই এক নিদর্শন। বঙ্গাব্দ ১৩২৫। সমসাময়িক সাহিত্যিক পরিসর যেন এক নতুন সময়ের দরজা খুলে দিচ্ছিল। আর আসছিল সিনেমা। 

শুধু চলচ্চিত্র নয়, কলকাতার বিনোদনজগতে তখন নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে বহু থিয়েটার। স্টার থিয়েটার, এম্পায়ার থিয়েটার, নাট্যমন্দির, আর্ট থিয়েটার, রংমহল-সহ শহরের নানা প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ হচ্ছে নাটক, প্রদর্শিত হচ্ছে চলচ্চিত্র। এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে থাকলেন বাঙালির কবিগুরু। কখনও কোনও সিনেমা হলের নামকরণের সঙ্গে যুক্ত হল তাঁর নাম, কখনও তাঁর সাহিত্যকর্ম জায়গা করে নিল চলচ্চিত্রে, আবার কখনও নিজেই অংশ নিলেন অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে।

১৯২৯ সাল। ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি সংবাদে রবীন্দ্রনাথের ‘তপতী’ নাটককে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ডমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেডের উদ্যোগে নির্মিত এই ছবিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বলে শোনা যায়। শান্তিনিকেতনে শুটিং হয়েছিল ছবিটির। কবি নিজেই দৃশ্যপটের সজ্জা দেখে নিচ্ছেন এক নজর। তাঁর পরিবারের সদস্য এবং ছাত্রছাত্রীরাও এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আট রিলে নির্মিত ছবিটি ইংরেজি নববর্ষে কলকাতায় প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়েছিল। ঠাকুর পরিবারের কোনও মহিলা ‘তপতী’র ভূমিকায় অভিনয় করবেন বলেও জানা যায়। চলচ্চিত্রটির প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন ধীরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। এই ঘটনা নিছক একটি সাহিত্যকর্মের চলচ্চিত্রায়ণ ছিল না। তৎকালীন কলকাতার সমাজে সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বিনোদনের নতুন পরিসর তৈরির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত, অভিজাত পরিবারের মহিলাদের সাংস্কৃতিক চর্চা এবং প্রকাশ্য বিনোদনজগতের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগের পরিসর তৈরির ক্ষেত্রেও এই ধরনের উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ঘরের অন্দরমহল থেকে সিনেমা ও অভিনয়ের জগৎ, এই যাত্রাপথে বদলাতে শুরু করেছিল সামাজিক দৃষ্টিকোণ।

সেই সময় কলকাতার বিভিন্ন সিনেমা হলেও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে নানা আয়োজন দেখা যেত। পূর্ণ থিয়েটারে এক দিকে প্রদর্শিত হচ্ছিল শব্দমুখর ছবি ‘মিডনাইট সান’, অন্য দিকে শোনানো হচ্ছিল সবাক চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের আবৃত্তি। চিত্রা সিনেমা হলেও বড়ুয়া প্রোডাকশনের ‘অপরাধী’র পাশাপাশি দর্শকদের জন্য ছিল কবির জাতীয় সঙ্গীতের আবৃত্তি। অর্থাৎ, সিনেমা হল তখন কেবল বিনোদনের স্থান নয়; সাহিত্য, সংগীত, অভিনয় এবং জাতীয় চেতনারও এক মিলনক্ষেত্র। এই সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছায়া সিনেমা হলও। উত্তর কলকাতার মানিকতলা বাজারের ঠিক উল্টো দিকে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রেক্ষাগৃহ এক সময় রবীন্দ্রনাথের পরিবারের নাটক ও অভিনয় প্রদর্শনের সাক্ষী হয়েছিল। আজকের দর্শকের কাছে জায়গাটি হয়তো শুধুই একটি পুরনো সিনেমা হল। অথচ তার অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার চলচ্চিত্রচর্চার এক সুপ্রাচীন অধ্যায়।

এই অঞ্চলেরই গড়পাড়ের বাড়ির কাছাকাছি সত্যজিৎ রায়ের নিজের ছবি দেখতে এসেছিলেন ছায়া সিনেমাহলে।  এক দিকে রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চা, অন্য দিকে পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎ রায়ের মতো চলচ্চিত্রকারের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে এই প্রেক্ষাগৃহের ইতিহাস কলকাতার সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জুড়ে গেছে।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতে তখন জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলের মতো। ‘গড সেভ দ্য কিং’ কিংবা ‘গড সেভ দ্য কুইন’-এর আনুগত্যের আবহ থেকে বেরিয়ে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজে নেওয়ার তাগিদ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, তাঁর কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের আবৃত্তি এবং দেশীয় নাট্যচর্চার উপস্থিতি নতুন তাৎপর্য জুড়ে দিচ্ছে। সিনেমা হলের পর্দা ও মঞ্চ তাই শুধু গল্প বলার মাধ্যম ছিল না, হয়ে উঠেছিল আত্মপরিচয় নির্মাণেরও এক বিচিত্র পরিসর। আজ বদলে গিয়েছে কতকিছুই। বদলেছে সিনেমাহলের সংজ্ঞা। দখল নিয়েছে ঝাঁ চকচকে মাল্টিপ্লেক্স। সিঙ্গেল স্ক্রিন এখন বিরল প্রজাতির প্রাণী। তবু এসব বদলের চাদর গায়ে মেখে আজও কলকাতা নীরব সাক্ষী কত ঐতিহ্যর।