Calcutta Television Network

শিমলা পাড়ার অলিগলিতে আজও জড়িয়ে মির্জা গালিবের কলকাতাযাপন

শিমলা পাড়ার অলিগলিতে আজও জড়িয়ে মির্জা গালিবের কলকাতাযাপন
29 September 2026 • 05:29:55 pm

কলকাতার ব্যস্ত বিডন স্ট্রিট থেকে বেথুন স্কুলের পিছন দিকে একটি সরু রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে। সেই পথই এখন সুপরিচিত বেথুন রো নামে। রাস্তা গিয়ে মিশেছে রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে। গোটা এলাকাটি একসময় পরিচিত ছিল শিমলা পাড়া নামে। একদা এখানেই ছিল শিমলা বাজার। এই পাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতনামা কবি মির্জা গালিবের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৮২৬ সাল। দিল্লি থেকে কলকাতায় পদার্পন মির্জা গালিবের। তখনও জনসমাজে পরিচিত নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান। দিল্লির মুঘল দরবারে তাঁর পরিচিতি যথেষ্ট। কবিতার অভূতপূর্ব প্রতিভার কারণে সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরও তাঁকে যথেষ্ট সম্মানের চোখে দেখতেন। গালিব শুধু একজন কবি ছিলেন না, বাদশাহর ঘনিষ্ঠজন হিসাবেও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল রাজ দরবারে। তবে সেই সময় মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য প্রায় অস্তমিত পশ্চিম আকাশে। দিল্লির সম্রাট কার্যত বন্দী ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। খানিকটা নির্ভরশীল প্রদেয় পেনশনের উপরও। গালিবও জর্জরিত আর্থিক সমস্যায়। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও মসৃণ ছিল না কোনোকালেই। বিদ্রোহী ও ইংরেজ-বিরোধী কিছু মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকতে পারে, এমন সন্দেহে পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হয় তাঁর।বিষয়টি মেটাতেই কলকাতায় আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দিল্লি থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছন গালিব। কখনও হেঁটে, কখনও ঘোড়ায়, আবার কখনও নৌকায় চেপে কাটে তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ। তাঁর আশা ছিল, কলকাতায় এসে বড়লাটের সঙ্গে দেখা করে নিজের বক্তব্য সরাসরি জানাতে পারবেন। পেনশন বন্ধ হওয়ার কারণটিও বোঝাতে সক্ষম হবেন তাঁকে। কলকাতায় এসে শিমলা বাজারের ১৩৩ নম্বর বাড়ি ঠিকানা হল তাঁর। পেলেন নতুন ঠাঁই। তাঁর লেখা ‘সফর-এ কলকাত্তাহ’-তে এই বাড়ি এবং আশপাশের বিবিধ এলাকার উল্লেখ রয়েছে। বাড়িটির সামনের বাজার, কাছের জলাশয়, সবটুকুই স্থান পেয়েছে তাঁর লেখায়। আজও ওই বাড়ির নম্বরটি এলাকার ইতিহাসের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিশে রয়েছে, যদিও পুরনো বাড়িটির চেহারা আজ বদলে গিয়েছে অনেক। কলকাতায় থাকার সময় শহরটির প্রতি গালিবের অমোঘ টান তৈরি হয়। তাঁর লেখায় কলকাতার সৌন্দর্য ও এখানকার মানুষের প্রতি মুগ্ধতার স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এমনকি আর্থিক সমস্যার মধ্যেও শহরের নানা এলাকা ঘুরে দেখেছেন তিনি। তাঁর কাছে কলকাতা ছিল অন্য রকম এক শহর। যে শহর খুব সহজে কাছের মনে হয়, যার অন্তরে মিশে থাকে এক অমোঘ টান।

পরবর্তী সময়, গালিবকে উত্তর কলকাতা ছেড়ে অন্যত্র থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শিমলা পাড়ার পরিবেশ ছেড়ে যেতে তিনি আগ্রহী হননি। হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকার মানুষের সঙ্গেও তাঁর এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। তাঁর দুর্দশার কথা শুনে অনেকেই সহানুভূতির চোখে দেখতেন এক সর্বহারা কবিকে। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় এসে কাঙ্ক্ষিত পেনশন ফিরে পাননি গালিব। বড়লাটের সঙ্গে কখনো তাঁর দেখাও হয়নি। ব্যর্থ মনেই পরবর্তীতে তাঁকে দিল্লিতে ফিরে যেতে হয়েছিল। তিনি শুধু পেয়েছিলেন কলকাতাকে। এক উদ্দাম বেঁচে থাকা, এক বিরল শহর। সাথে শিমলা পাড়ার মানুষের ভালোবাসা। আজকের ব্যস্ত উত্তর কলকাতায় মির্জা গালিবের সেই দিনগুলির স্মৃতি বিস্মৃতির আড়ালে। অথচ তাঁর লেখায় এখনও বেঁচে রয়েছে সেই সময়ের কলকাতা, শিমলা বাজার এবং এখানকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আখ্যান। শহরের পুরনো অলিগলির মধ্যে আজও নিঃশব্দে মিশে আছে এক মহাকবির কলকাতা-জীবনের গল্প।

×
  • CTVN