আশৈশব দেখে আসা লেবুতলা পার্ক। তখন ছিল না এত ধুমধাম। তবু শিয়ালদা নেমে এস এন ব্যানার্জী রোড হয়ে দিব্যি পৌঁছে যাওয়া যেত বড়ো পুজো দেখতে। তখন কোথায় ক্যাব, ক্যাবলা কিশোর পায়ে পায়েই পৌঁছে যেত। আরেকটা নামও ছিল। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। কেউ কেউ ‘স্কোয়ার’ উহ্য রেখে ‘পার্ক’ও জুড়তো অবশেষে। তবে পুজো ছাড়া আর বিশেষ কেউ মারাতো না ও চত্বর। নাকি যেতও কেউ কেউ! যেমন আশেপাশের শিশুরা কিংবা সাঁতারের ক্লাব। জনসাধারণ দুর্গাপুজোকে মনে রাখলেও, এই সবকিছুই ছিল একটা পার্ককে কেন্দ্র করে। কিন্তু কেউ কী মনে রেখেছে নামকরণের তাৎপর্য? আজ্ঞে না। বাংলা প্রশ্নপত্রে এ প্রশ্ন বহুবার আসলেও, বাস্তবে আমরা ‘নামে কি আসে যায়’ তত্ত্বেই অধিকতর ভরসা রাখি। তাই বিস্মৃত হই ঐতিহ্য। ভুলে যাই ইতিহাস।
নাম ও ইতিহাস চর্চা নিয়ে যারা ওয়াকিবহাল তারা জানবে, এই গোটা পার্কটিই উৎসর্গ করা হয়েছে এক বিপ্লবীকে। শহীদ সন্তোষ মিত্র। বেঁচেছিলেন মাত্র ৩১ বছর। জুড়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে। যদিও পরবর্তীতে গ্রেফতার হন। তার আগে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুন্ঠণের সাথেও। গ্রেফতারির পর তাঁকে পাঠানো হয় হিজলী কারাগারে। জেলবন্দী থাকাকালীনই ইংরেজদের গুলিতে প্রাণ হারান। ১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩১। পরবর্তীতে তাঁর আবক্ষ প্রস্তরমূর্তি স্থাপিত হয় সেখানে।
এখানে দুর্গাপুজোর ইতিহাসও বহু প্রাচীন। আগে এর নাম ছিল শিয়ালদা সর্বজনীন দুর্গোৎসব। ১৯৩৬ নাগাদ কিছু মানুষ বারোয়ারি দুর্গাপুজো শুরু করার কথা ভাবেন। শুরুও হয়। সেই প্রথম বছরেই বিজয়া সম্মেলনী উপলক্ষে ভারতবর্ষে প্রথম জলসা শুরু হয় এই উদ্যান চত্বরে। সেইসময় জলসায় অংশগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মন, নির্মলা মিশ্র, পঙ্কজ মল্লিক, পান্নালাল ভট্টাচাৰ্য প্রমুখ। সার্পেন্টাইন লেনের জমিতে পুজো আয়োজন নিয়েও বিরোধ বাঁধে একসময়। তখন এই পুজো স্থানান্তরিত হয়, সেন্ট জেমস স্কোয়ারে, যা আজকের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার।
স্কোয়ার সংলগ্ন এই লেনের সাথেও জুড়ে আছে ইতিহাসের হাতছানি। ভারতবর্ষের বিখ্যাত ঘুড়ির দোকান ইন্ডিয়ান কাইটসের যাত্রাও শুরু এই সার্পেন্টাইন লেন থেকে। লেবুতলা এমনিই পুরোনো এলাকা। আশেপাশে বহুতল তুলনামূলক কম। অধিকাংশই পুরোনো বনেদি বাড়ি। সরু সরু গলি। ভাঙাচোরা ইঁটের পাঁজা। পুরোনো দেওয়াল লিখন। এসবকিছুর মাঝেই স্থান করে নিয়েছে কলকাতার পুজো। বিস্মৃত বিপ্লবীর নামাঙ্কিত ইতিহাস।