Calcutta Television Network

পোড়ো মন্দিরে হারানো জিন শহর

পোড়ো মন্দিরে হারানো জিন শহর
7 October 2026 • 02:02:49 pm

নাম শুনলে মনে হতে পারে, ‘জিন শহর’ বুঝি কোনও প্রাচীন নগরী। আসলে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর ১ ব্লকের কাঁসাই নদীর ধারে থাকা একটি ক্ষুদ্র জনপদ। তবে সাধারণ গ্রামের মতো নয়, এই জনপদের মাটির নিচে এবং চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো জৈন সংস্কৃতির স্মৃতিখন্ড। এক সময় এই এলাকা ছিল জৈন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ বসতি এবং নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র। এই জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। খড়্গপুর-মেদিনীপুর সড়কে মোহনপুর সেতু পেরিয়ে কাঁসাইয়ের বাঁধ ধরে প্রায় চার কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় জিন শহর। এক সময় এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের জমজমাট পরিবেশ ছিল বলে ইতিহাসবিদদের একাংশের ধারণা। জৈন বণিকদের আনাগোনাও ছিল বিস্তর। তাঁদের উদ্যোগেই এলাকায় বেশ কিছু ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে উঠতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সেগুলির অধিকাংশই অতীত হয়ে গেলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনও পুরাতন সাক্ষ্য বহন করছে। জিন শহরের কাছেই বালিহাটিতে ছিল আরও একটি সুবিশাল জৈন মন্দির। সেখানে কালো পাথরের তৈরি মহাবীরের একটি বড় বিগ্রহ ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। কাঁসাইয়ের ভাঙনে সেই স্থাপনা নদীর গর্ভে তলিয়ে যায়। এখন শুধু কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের অংশবিশেষ চোখে পড়ে। মহাবীরের মূর্তিটি পরে প্রত্নতত্ত্ব দফতর নিয়ে যায় বলেও জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। এই অঞ্চলে জৈন ধর্মের উপস্থিতি যে বহু প্রাচীন, তার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায়।

খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতক থেকেই বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকায় জৈন ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মহাবীরের সময় থেকেই রাঢ় অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় জৈন ধর্মের প্রচার শুরু হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদদের মত। দামোদর, কাঁসাই এবং সুবর্ণরেখার অববাহিকায় জৈন সংস্কৃতির বহু নিদর্শন আজও খুঁজে পাওয়া যায়। জিন শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলির একটি হল প্রাচীন জৈন দেউল। গবেষকদের মতে, স্থাপনাটি সম্ভবত দশম শতকের। দেউলটি পূর্বমুখী এবং এর গঠন অন্য অনেক জৈন মন্দিরের তুলনায় বেশ খানিকটা আলাদা। এক সময় এটি ছিল দু’তলা এবং তিনটি কক্ষ নিয়ে তৈরি। পাথরের তৈরি দেওয়াল ও ছাদ এখনও কিছুটা টিকে রয়েছে। যদিও দক্ষিণের অংশটি অধিকাংশটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ভিতরের একটি কক্ষে পাথরের তৈরি ধ্যানমগ্ন তীর্থঙ্করের মূর্তিও বিদ্যমান। ক্ষয়ে যাওয়া মূর্তিটির পরিচয় স্পষ্ট নয়। তবে সেটি মহাবীরের মূর্তি হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। কাঁসাই নদীর তীরে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া জৈন মূর্তিগুলির অনেকগুলিই পরে স্থানীয় মানুষের কাছে ভিন্ন নামে দেবতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কোথাও পার্শ্বনাথকে ধন্বন্তরী, কোথাও বাসুলি বা অন্য স্থানীয় দেবতার রূপে পুজো করা হয়। কিন্তু জিন শহরের তীর্থঙ্কর মূর্তিটি এখনও কোনও স্থানীয় দেবতার রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। ‘জিন’ শব্দের অর্থ জয়ী। জৈন ধর্মে যাঁরা আত্মসংযম ও সাধনার মাধ্যমে পার্থিব বন্ধন অতিক্রম করেছেন, তাঁদের বলা হয় ‘জিন’। সেই থেকেই এই এলাকার নাম জিন শহর হয়েছে বলে মনে করেন গ্রামবাসী। কিন্তু ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আজ অবহেলার মুখে। আশপাশের বিভিন্ন জৈন স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জিন শহরের পুরনো দেউল আজও জীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দ্রুত সংরক্ষণ না হলে কাঁসাইয়ের ভাঙনের পাশাপাশি সময়ের ক্ষয়েও হারিয়ে যেতে পারে রাঢ়বঙ্গের জৈন ইতিহাসের এই মূল্যবান স্মারক।