একসময় কলকাতার বুক দিয়েই ছুটত ঝমাঝম রেলগাড়ি। আজ যেখানে ব্যস্ত রাস্তা, বাড়িঘর আর যানজট, সেখানেই একদা শোনা যেত রেলের কুউউউ। সেই রেলগাড়ির গন্তব্য ছিল কালীঘাট থেকে ফলতা। সময়ের সঙ্গে সেই রেলপথ ক্রমে হারিয়ে গেল, বদলে গেল আলীনগরের চেহারা। কিন্তু কিছু জায়গার নাম আজও দিব্যি বহন করে চলেছে সেই পুরনো রেলপথের স্মৃতি। ১৯১৭ সালের ২৮ মে কালীঘাট থেকে ফলতা পর্যন্ত রেল পরিষেবা চালু করেছিল ব্রিটিশ কোম্পানি ম্যাকলিয়ড। এই রেলপথের সরকারি নাম ছিল ‘কালীঘাট-ফলতা রেলওয়ে’, সংক্ষেপে KFR। প্রায় ৪৩ কিলোমিটার সুদীর্ঘ এই পথে ছিল মোট ১৮টি স্টেশন। মূলত সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার মূল সংযোগ ছিল এই রেলপথটি। সেই সময় গ্রামের মানুষের কাছে ধীরেধীরে পরিচিতি পাচ্ছে রেলগাড়ি। স্থানীয় মানুষজন তৎকালীন বঙ্গে নিজেদের মতো করে রেলটিকে ‘ম্যাকলিয়ড সাহেবের গাড়ি’ বলে ডাকতেন। ছোট লাইট রেলওয়ের এই ট্রেন খুব দ্রুতগতির কিন্তু ছিল না। তবে গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কালীঘাটের মন্দিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই রেলপথ ব্যবহার করতেন বহু মানুষ। তৎকালীন ব্যবস্থায় কালীঘাটের দিকে যেতে যাত্রীদের মাঝেরহাট স্টেশনে নামতে হত। সেখান থেকে রেলপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া যেত দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে। ধর্মীয় কারণে কালীঘাটে আসা মানুষের পাশাপাশি গ্রামের নানা প্রয়োজনেও এই ট্রেন ব্যবহার করা হত। রেলপথটি শুধু যাত্রী পরিবহণের জন্য ছিল না। সেই সময় গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও রেলগাড়ির এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কোথাও কোনও যাত্রী রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হাত দেখালে এই ট্রেন নাকি থেমে যেত। কখনও স্থানীয় মানুষ শহরে পাঠানোর জন্য সামান্য জিনিসও ট্রেনে তুলে দিতেন। আবার শহর থেকে ফেরার সময় রেলকর্মীদের হাত ধরে গ্রামে পৌঁছত শহরবাসীর পাঠানো নানা খবর। আজকের শহুরে পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে সেই ছবির তুলনা করলে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হয়। নির্দিষ্ট স্টেশন ছাড়াও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেন থামানোর এমন ঘটনা তখন একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল না। রেললাইনটি যেন গ্রাম ও শহরের মধ্যে একটি চলমান সেতুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো। কালীঘাট-ফলতা রেলপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল ম্যাকলিয়ড কোম্পানি। একই সময়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে রেল যোগাযোগ বাড়ানোর কাজও চলছিল। আহমেদপুর-কাটোয়া, বর্ধমান-কাটোয়া এবং বাঁকুড়া-দামোদর অঞ্চলেও রেলপথ বিস্তারের কাজ চলছিল একইসাথে, চালাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি। এই সময়েই রেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন মেটাতে নানা দেশ থেকে তৈরি ইঞ্জিন ভারতে আসতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিশরের ডেল্টা অঞ্চলের রেলপথের জন্য তৈরি কিছু ইঞ্জিনও নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। তার মধ্যে কয়েকটি ইঞ্জিন পাড়ি দেয় ভারতে। পরে দেশের বিভিন্ন অনুন্নত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেল পরিষেবা চালুর কাজে সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কালীঘাট-ফলতা রেলওয়ে ছিল সেই বৃহত্তর রেল বিস্তারেরই একটি অংশ।
একদিকে কলকাতার সঙ্গে দক্ষিণের গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে রেলপথের পাশে গড়ে উঠছিল বিচ্ছিন্ন জনবসতি ও বাজার। রেলকে কেন্দ্র করে এলাকার অর্থনীতি এবং মানুষের চলাফেরাতেও ধীরেধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আজ সেই রেললাইন আর নেই। যে পথে একসময় ছোট রেলগাড়ি চলত, তার অনেকটাই এখন শহরের ব্যস্ত রাস্তার অংশ। জেমস লঙ সরণির মতো পরিচিত এলাকার সঙ্গেও সেই পুরনো রেলপথের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ঘোলশাপুর, শখের বাজার ইত্যাদি এলাকাও সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সময় বদলেছে। গ্রাম পেরিয়ে শহর এগিয়ে এসেছে অনেক দূর। পুরনো রেললাইন মুছে গিয়েছে, বদলে গিয়েছে মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম। গ্রামবাংলাও এখন মফস্বলে রূপান্তরিত। কিন্তু পুরনো ছবি, নথি আর স্থানীয় স্মৃতিতে জীবন্ত সেই ছোট্ট রেলগাড়ি। একসময় হয়তো কোনও গ্রামবাসী কালীঘাটের মন্দিরে যাওয়ার জন্য রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রেন থামার অপেক্ষা করতেন। কারও হাতে থাকত পুজোর সামগ্রী, কারও সঙ্গে থাকত মানতের উপকরণ। সেই মানুষগুলো নেই, রেলগাড়িও নেই। রয়ে গিয়েছে শুধু কিছু পুরনো ছবি, কয়েকটি স্থাননাম এবং কলকাতার ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়, কালীঘাট-ফলতা রেলওয়ে, যা আজ জেমস লঙ সরণি।