Calcutta Television Network

ক্যান্সার ট্রেন ও পাঞ্জাবের একটি গ্রাম

ক্যান্সার ট্রেন ও পাঞ্জাবের একটি গ্রাম
2 October 2026 05:26:59 pm

ভারতে এমন একটি ট্রেন রয়েছে, যাকে স্থানীয় মানুষজন চেনেন ‘ক্যানসার ট্রেন’ নামে। নামটি শুনতে খানিক অস্বাভাবিক ঠেকে কানে, তবু এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই ট্রেনের যাত্রীদের বড় অংশই ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে রাজস্থান গমন করেন। প্রতি রাতে পাঞ্জাব প্রদেশের বঠিন্ডা স্টেশনে এসে দাঁড়ায় আবহর-যোধপুর এক্সপ্রেস। রাত ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ স্টেশনে পৌঁছনো এই ট্রেনেই বহু রোগী ও তাঁদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা চিকিৎসার জন্য বিকানেরের উদ্দেশে রওনা হন। ট্রেনটির গন্তব্য যোধপুর হলেও অধিকাংশ রোগীই বিকানেরে নেমে পড়েন। ভোরের দিকে প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ট্রেন পৌঁছয় গন্তব্যে। স্টেশন থেকে রোগীরা রওনা দেন আচার্য তুলসী রিজিওনাল ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের উদ্দেশ্যে। চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় পাঞ্জাবের বহু পরিবার এই হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। রোগীদের সঙ্গে থাকেন পরিবারের মানুষ। হাতে থাকে ছোট ব্যাগ, সঙ্গে রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্য ট্রেনযাত্রায় একটি বিশেষ সুবিধাও রয়েছে। তাঁদের রেল টিকিটের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু ছাড় পাওয়া যায়। রোগীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তির টিকিটেও দেওয়া হয় উল্লেখযোগ্য ছাড়। ফলে দূরের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই ট্রেনটি বহু পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন পাঞ্জাব থেকে এত মানুষকে চিকিৎসার জন্য রাজস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে নজর দিতে হয় পাঞ্জাবের মালব অঞ্চলের দিকে। বঠিন্ডা, মানসা, মুকসার, ফরিদকোট এবং ফিরোজ়পুরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই গোটা এলাকাটা। একসময় কৃষিফসল উৎপাদনের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল এটি। বর্তমানে অবশ্য এই অঞ্চলে ক্যানসারের প্রকোপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষা ও রিপোর্টে মালব অঞ্চলে ক্যানসারের হার নিয়ে আশঙ্কার কথা সামনে এসেছে। চিকিৎসার জন্য তুলনামূলক কম খরচে ভালো পরিকাঠামোর সন্ধানে বহু রোগী তাই বিকানেরে যাত্রা করেন। পাঞ্জাব সরকারও ক্যানসার আক্রান্তদের আর্থিক সাহায্যের জন্য ‘মুখ্যমন্ত্রী পাঞ্জাব ক্যানসার রাহাত কোশ’ নামক একটি প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। মালব অঞ্চলে ক্যানসারের কারণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বার বার উঠে আসে কৃষি ব্যবস্থার বিপুল পরিবর্তনের কথা। ষাটের দশকে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। সেই সময় পাঞ্জাবের উর্বর জমি এবং জলসম্পদের উপর নির্ভর করে কৃষিতে একটি বৃহৎ পরিবর্তন আসে। শুরু হয় সবুজ বিপ্লব। বেশি ফলনের লক্ষ্যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে গ্রামাঞ্চলগুলিতে। পরবর্তী কয়েক দশকে কৃষিজমিতে রাসায়নিক ব্যবহারের পরিমান ক্রমাগত বেড়েছে। বিশেষ করে তুলো চাষের সময় কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কৃষকেরা সেই রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতেন। দীর্ঘদিন ধরে এর প্রভাব নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু জমি নয়, ভূগর্ভস্থ জল নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ২০০০-এর দশকে মালব অঞ্চলের জল নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষকের উপস্থিতির কথাও সামনে আসে। কয়েকটি গবেষণায় ভূগর্ভস্থ জলে ইউরেনিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ও গবেষকদের মনে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নও তোলা হয় এ নিয়ে। ইউরেনিয়ামের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে দূষিত জল নিয়মিত পান ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যান্সারের কোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে মালব অঞ্চলে ক্যানসারের জন্য শুধুমাত্র ইউরেনিয়াম বা কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিককেই দায়ী করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আরও বিশদ অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ক্যানসারের পিছনে পরিবেশগত দূষণ ছাড়াও জিনগত কারণ, জীবনযাপন, তামাকের ব্যবহার এবং অন্যান্য একাধিক বিষয় থাকতে পারে। জলদূষণ নিয়ে অবশ্য উদ্বেগের আরও কারণ রয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় কিছু এলাকায় সীসা, আর্সেনিক ও নাইট্রেটের উপস্থিতির কথাও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দূষিত জল ব্যবহার করলে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর তার গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষির উৎপাদন বাড়াতে যে ব্যবস্থার উপর একসময় জোর দেওয়া হয়েছিল, তার পরিবেশগত প্রভাব নিয়েই এখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। বছরের পর বছর একই ধরনের ফসল চাষ, মাটির উপর অতিরিক্ত চাপ এবং বিপুল রাসায়নিক নির্ভরতা কৃষি ব্যবস্থার নানা সমস্যাকে আরও বৃদ্ধি করেছে, বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এলাকার সাধারণ পরিবারগুলির উপর। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ সামলাতে অনেক পরিবারকে নিজেদের তিলতিল করে জমানো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। কোথাও জমি বা গয়না বিক্রির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। চিকিৎসার জন্য কয়েকশো কিলোমিটার দূরে ছুটতে হচ্ছে রোগীদের। আর সেই যাত্রার অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে বঠিন্ডা থেকে বিকানেরগামী এই ট্রেন। মালব অঞ্চলের ক্যানসার সমস্যা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট ও গবেষণায় এই এলাকার জল, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। নিরাপদ পানীয় জল, কৃষিতে রাসায়নিকের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্থানীয় স্তরে উন্নত ক্যানসার চিকিৎসার পরিকাঠামো, এই সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে প্রশাসনিক তরফে। আজও তাই রাত নামলে বঠিন্ডা স্টেশনে দেখা যায় বহু মানুষের ভিড়। কারও হাতে রিপোর্টের ফাইল, কারও সঙ্গে অসুস্থ বাবা-মা, আবার কেউ পরিবারের সদস্যকে নিয়ে চিকিৎসার আশায় ট্রেনে ওঠেন। কয়েক ঘণ্টার সেই যাত্রা শুধু একটি শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার চিত্র নয়, পাঞ্জাবের একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য সংকটের ছবিও দেশবাসীর কাছে প্রকট করে তোলে।

×
  • CTVN