Calcutta Television Network

চর্যাপদ; বাংলা সাহিত্যের সূতিকাগার ও গুপ্ত সাধনার রহস্য...

চর্যাপদ; বাংলা সাহিত্যের সূতিকাগার ও গুপ্ত সাধনার রহস্য...

19 August 2025 , 01:03:02 pm

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য নিদর্শন হল চর্যাপদ। এটি শুধু একটি কাব্যসংকলন নয়, বরং বাংলা ভাষার জন্মলিপি, যেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা, ধর্মীয় তত্ত্ব, লোকজীবনের ছবি এবং কবিতার ছন্দ মিলেমিশে এক অনন্য সাহিত্যরূপ ধারণ করেছে। প্রায় এক হাজার বছর আগেকার রচিত এই পদগুলো আমাদের জানায়-কীভাবে বৌদ্ধ সহজযান সাধকরা গুপ্ত ভাষায় তাঁদের তত্ত্বকথা লুকিয়ে রাখতেন, আর একইসঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি।

‘চর্যা’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য

‘চর্যা’ মানে আচরণ বা সাধনা, আর ‘পদ’ মানে গান বা ছন্দবদ্ধ রচনা। তাই চর্যাপদ হল সাধনার গান। এগুলোতে সাধকের অভ্যন্তরীণ তপস্যার রহস্য, আধ্যাত্মিক আনন্দ, মানবদেহকে সাধনাক্ষেত্র হিসেবে ব্যাখ্যা এবং মুক্তির পথ ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এখানে মূলত সহজযান বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব ধ্বনিত হয়েছে। সহজযানের দর্শন ছিল-'মহাসুখ নির্বাণ অর্জন সম্ভব সহজভাবে, দেহমধ্যেই।' তাই চর্যা শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং সাধনার ছক।

আবিষ্কার

চর্যাপদ বহু শতাব্দী ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। অবশেষে ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রাজগ্রন্থাগারে গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী একটি পুঁথি খুঁজে পান। পুঁথিটির নাম ছিল চর্যাচর্যবিনিশ্চয়। এতে ৪৭টি পদ এবং কিছু বজ্রযান বিষয়ক দোহা লিপিবদ্ধ ছিল।

১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হলে সাহিত্য জগতে আলোড়ন ওঠে। কারণ এর মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন সবার সামনে আসে।

কবি ও সিদ্ধাচার্যরা

চর্যাপদের কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, যাঁরা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তাঁদের নামের শেষে ‘পা’ যুক্ত থাকত।

লুইপা - চর্যার আদি কবি।

কাহ্নপা - সর্বাধিক পদ রচয়িতা, তাঁর লেখা ১৩টি পদ।

ভুসুকুপা - নালন্দা মহাবিহারের ভিক্ষু, ৮টি পদ।

সরহপা - ৭টি পদ, যেখানে গুপ্ত ভাষায় বৌদ্ধ তত্ত্ব প্রকাশ।

শবরপা - শবর-শবরীর প্রেমকাহিনি দিয়ে চর্যাপদে অনন্য মাত্রা এনেছেন।

এছাড়াও টান্তিপা, ঢেনকাপা, কুক্কুরিপা, আরজোপা প্রমুখের নাম পাওয়া যায়।

চর্যাপদের ভাষা

চর্যাপদের ভাষা আজকের পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য। একে বলা হয় 'সন্ধ্যা ভাষা', মানে আধো আলো-আধো অন্ধকার। এতে গুপ্ত সংকেত, রূপক, প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সরাসরি অর্থ না বুঝতে পারে, কেবল সিদ্ধ সাধকরাই আসল তত্ত্ব ধরতে পারেন।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, চর্যাপদে প্রাচীন বাংলার আদি রূপ রয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একে বলেছেন বঙ্গকামরূপী ভাষা। বাস্তবে, চর্যাপদের ভাষা হলো বাংলা, মাগধী, অপভ্রংশ ও প্রাকৃতের এক মিশ্র রূপ।

ধর্মতাত্ত্বিক দিক

চর্যাপদের মূল দর্শন সহজযান বৌদ্ধধর্ম। এখানে দেহকে সাধনক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। বলা হয়েছে- 'সহজানন্দ মহাসুহ লীলে।' (ভুসুকুপা) 

অর্থাৎ সহজানন্দেই মহাসুখ বা নির্বাণের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।

এই দর্শনের প্রভাবেই চর্যাপদে দেহ, প্রেম, নারী-পুরুষ সম্পর্ক সবকিছু রূপক হয়ে উঠেছে সাধনার অংশ।

চর্যাপদের প্রবাদবাক্য

চর্যাপদে অনেক প্রবাদ ও লোকজ উক্তি আছে, যা আজও প্রচলিত। যেমন- 

'অপণা মাংসে হরিণা বৈরী' - নিজের দোষেই সর্বনাশ ঘটে।

'হাথে রে কাঙ্কাণ মা লোউ দাপণ' - নিজের জিনিস বোঝাতে অন্য কিছুর প্রমাণ লাগে না।

'আনা চালে ভাত নাই, গণ্ডায় গণ্ডায় দই' - প্রয়োজনীয় বস্তু নেই, অথচ অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরপুর।

এগুলো থেকে বোঝা যায়, চর্যা শুধু তত্ত্বকথা নয়, বরং সমকালীন লোকজীবনের প্রতিফলনও।

চর্যাপদের কবিতার ধারা

চর্যাপদ মূলত গান বা গীতিকবিতা। প্রতিটি পদে সুর ছিল, যা সাধকরা গাইতেন। এগুলোকে বলা হয় দোহা ছন্দ। গানের ভেতর দিয়ে তত্ত্বকথা ও সাধনার রহস্য সহজে প্রকাশ করা হতো।

উদাহরণস্বরূপ- 

কাহ্নপা বলেছেন:

'গগনে গরজে মেঘ, ধরণী কাঁপে,

তাহার মাঝে উদয় হয় অমৃত জ্যোতি।'

এখানে মেঘ, ধরণী, অমৃত-সবই প্রতীক। 

নবচর্যা ও নতুন চর্যাপদ

চর্যাপদের আবিষ্কারের পরেও গবেষণা চলতে থাকে।

নবচর্যা: শশীভূষণ দাশগুপ্ত ১৯৬৩ সালে নেপাল থেকে প্রায় ২৫০টি চর্যা সংগ্রহ করেন।

নতুন চর্যাপদ: ২০১৭ সালে ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ ৩৩৫টি পদ প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়, চর্যা কেবল প্রাচীন যুগে নয়, পরবর্তীকালেও রচিত হয়েছে।

চর্যাপদকে বলা যায় বাংলা সাহিত্যের সূতিকাগার। কারণ-

এটি বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন।

এতে কবিতার ছন্দ, সুর ও রূপক ব্যবহার আছে।

এতে সমাজজীবন, লোকপ্রবাদ, আধ্যাত্মিক সাধনা একসঙ্গে ধরা পড়েছে।

এর মধ্যে ভারতীয় দর্শনের এক অনন্য শাখা (সহজযান) প্রকাশ পেয়েছে।

চর্যাপদ শুধু সাহিত্য নয়, এটি আধ্যাত্মিক সাধনার দলিল। এখানে একদিকে যেমন বৌদ্ধ সহজযান তত্ত্ব ধরা আছে, অন্যদিকে আছে বাংলা ভাষার আদি রূপ। চর্যার কবিরা তাঁদের গোপন সাধনার মন্ত্রকে লোকজ গান ও রূপকের ভেতর গেঁথেছেন।

তাই চর্যাপদকে যথার্থই বলা যায়- 'বাংলা সাহিত্যের সহস্রবর্ষী গুপ্তধন, যেখানে ভাষা, সাধনা ও কবিতা মিলেমিশে অমরত্ব লাভ করেছে।'

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN