শ্রাবণ মাসের শেষ অমাবস্যা-যা সারা ভারতের তান্ত্রিক সাধক, শাক্ত উপাসক ও গূঢ়তত্ত্বে আগ্রহী ভক্তদের কাছে এক বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ রাত্রি-একে আমরা চিনি কৌশিকী অমাবস্যা নামে। এ বছরের কৌশিকী অমাবস্যা (Kaushiki Amavasya 2025) পড়েছে ২০ অগাস্ট ২০২৫-এ। শাস্ত্র মতে, এই তিথি মহামায়া কৌশিকীর আবির্ভাব দিবস, যিনি দেবী দুর্গার এক রহস্যময় এবং তেজস্বিনী রূপ।
'মার্কণ্ডেয় পুরাণ'-এর দুর্গাসপ্তশতী অংশে কৌশিকী দেবীর জন্মকথা বর্ণিত আছে। দেবী পার্বতী যখন হিমালয়ের কন্যা রূপে কৈলাসে অবস্থান করছিলেন, তখন একবার দেব-অসুর সংঘর্ষে অসুর সেনাপতি শুম্ভ-নিশুম্ভ দেবতাদের স্বর্গ থেকে উৎখাত করে দেন। দেবতারা শরণ নিলেন মহামায়ার কাছে। সেই সময় দেবী পার্বতীর শরীর থেকে যে অদ্ভুত উজ্জ্বল তেজস্বী কান্তি বেরিয়ে এল, সেই তেজ থেকেই জন্ম নিলেন দেবী কৌশিকী।
কৌশিকী দেবী ছিলেন অপরূপা ও অপরাজেয়। তিনি অসুরদের মুগ্ধ করে যুদ্ধে আহ্বান জানান। শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডের বিনাশের মাধ্যমে তিনি দেবলোক পুনরুদ্ধার করেন। শাস্ত্রে বলা হয়, কৌশিকী রূপ আসলে দেবীর যুদ্ধশক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক—যেখানে তিনি বিনয়ী গৃহিণী নন, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্জয় রাণী।
কৌশিকী অমাবস্যা সাধারণত শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথিতে পড়ে, যদিও উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে ভাদ্র মাসে মানা হয়। অমাবস্যা নিজেই চন্দ্রশক্তির গভীরতম বিন্দু—যখন চাঁদ অদৃশ্য, তৎসময় মন ও অবচেতনের গহীন স্তর উদ্ভাসিত হয়।
এই রাত্রিতে তান্ত্রিক উপাসনা, শ্যামাপূজা, ভৈরব আরাধনা, ও নবচণ্ডী যজ্ঞ বিশেষ ফলপ্রদ বলে মনে করা হয়। জ্যোতিষ মতে, চন্দ্র ও সূর্যের মিলিত শক্তি (অমাবস্যা যোগ) যখন দেবীর উদ্ভবতিথির সঙ্গে মিলে যায়, তখন মনস্তাত্ত্বিক শুদ্ধি ও শক্তি লাভের সেরা সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলা, আসাম, ও ওড়িশার শাক্ত মন্দিরগুলোতে এই রাত্রিতে বিশেষ ভোগ ও যজ্ঞের আয়োজন হয়। তান্ত্রিকদের জন্য এ রাত্রি এক সিদ্ধি-সাধনার ক্ষেত্র। পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হল-
১) মধ্যরাত্রির মহামায়া পূজা – রাত ১২টার পর মূল আরাধনা হয়।
২) চণ্ডীপাঠ – দুর্গাসপ্তশতীর পূর্ণ পাঠ।
৩) লাল ফুল, লাল বস্ত্র, ও রক্তচন্দন – দেবীর রাগময় রূপের প্রতীক।
৪) মদ্য-মাংস-তিল অর্ঘ্য – তান্ত্রিক শাস্ত্রে বর্ণিত পঞ্চমকার পূরণের জন্য।
তীর্থক্ষেত্র-
তারাপীঠ (বীরভূম) – তান্ত্রিক সাধনার অন্যতম কেন্দ্র। এই রাত্রিতে অসংখ্য সাধক সমবেত হন।
কমাখ্যা মন্দির (অসম) – এখানে কৌশিকীকে মহামায়ার এক বিশেষ রূপে পুজো করা হয়।
কালীঘাট (কলকাতা) – শাক্ত তীর্থ হিসেবে পূর্ণরাত্রি ভক্তসমাগম হয়।
মহিষমর্দিনী মন্দির, হিমাচল – পুরাণ অনুযায়ী দেবী এখানে অসুর বিনাশের পর বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
শাস্ত্র মতে, কৌশিকী অমাবস্যা এমন এক রাত্রি যখন দেবী নিজের শক্তিকে ভক্তদের মাঝে বিলিয়ে দেন। যারা জীবনে বাধা, ভয়, বা শত্রুর দ্বারা পীড়িত-তারা এই রাতে দেবীর শরণ নিলে মুক্তি পেতে পারেন।
মনস্তত্ত্বের দিক থেকেও অমাবস্যা মানে অবচেতনের অন্ধকারে প্রবেশ করা। কৌশিকী পুজো সেই অন্ধকারে আত্মশক্তির দীপ জ্বালানোর প্রতীক। এই দিনে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, ও সংগ্রামী মনোভাবকে জাগ্রত করার সাধনা করা হয়।
তান্ত্রিক মতে, কৌশিকী অমাবস্যা হল শক্তি-উদ্ভবের রাত। যোগিনী হৃৎকমল চক্রে শক্তিকে উন্মোচনের জন্য বিশেষ মন্ত্রজপ, কুণ্ডলিনী জাগরণ, এবং রাত্রি ভর ধ্যানের ব্যবস্থা হয়। অনেকেই শ্মশান, গুহা বা নির্জন স্থানে সাধনা করেন।
যারা গূঢ়তত্ত্বে না গিয়ে কেবল ভক্তি ও শান্তি চান, তারা এই দিনে-
১) গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জলে স্নান করে লাল ফুল দিয়ে দেবীর পূজা করতে পারেন।
২) দুর্গাসপ্তশতী বা অন্তত 'আথচন্দী পাঠ' পাঠ করতে পারেন।
৩) লাল চুড়ি, সিঁদুর, ও মিষ্টি নারীদের মধ্যে বিতরণ করলে শুভফল লাভ হয়।
কবে কৌশিকী অমাবস্যা?
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা – ২০ অগাস্ট, ২০২৫
অমাবস্যা শুরু – ১৯ অগাস্ট ২০২৫, সন্ধ্যা ৭:০৪ মিনিট
অমাবস্যা শেষ – ২০ অগাস্ট ২০২৫, সন্ধ্যা ৮:৩৬ মিনিট
মূল পূজার সময় – ২০ অগাস্ট, রাত ১০টা থেকে মধ্যরাত ১২:৩০ এর মধ্যে।