ত্রিলোকের প্রভু, রুদ্র রূপে প্রলয়, বোলানাথ রূপে দয়াময়, যোগীরাজ রূপে নিস্পৃহ-শিব একাই বহুরূপে বিরাজমান। কিন্তু এত প্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে শিবকে ঘিরে এমন কিছু কাহিনী ও লোকবিশ্বাস রয়েছে, যেগুলি কম প্রচারিত, অথচ দারুণ আকর্ষণীয়। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো শিবের এমন সাতটি রোমাঞ্চকর কাহিনী।
১. শিবের নারীরূপ: ‘মোহিনী’ না ‘বৃহন্নলা’?
পুরাণে বলা হয়েছে, ত্রিপুরাসুর বধের আগে দেবতারা একটি বিশেষ শক্তির জন্য নারীরূপ ধারণের প্রার্থনা করেন। বিষ্ণুর ‘মোহিনী’ রূপ যেমন পরিচিত, তেমনই একটি অপ্রচলিত সংস্করণে শিবও একবার ‘বৃহন্নলা’ নামে নারীর বেশে উপস্থিত হন, যেন মায়াজাল তৈরি করে দানবদের ধ্বংস করা যায়।
২. ভৈরবের জন্ম: ব্রহ্মার পঞ্চম মুখের বিনাশ
একবার ব্রহ্মা ঘোষণা করেন—তিনিই সৃষ্টিকর্তা, তিনিই শ্রেষ্ঠ। শিব তা সহ্য করতে না পেরে তাঁর কপাল থেকে ভৈরবকে সৃষ্টি করেন।
ভৈরব গিয়ে ব্রহ্মার পঞ্চম মুখ ছিন্ন করেন। এতে শিব হয়ে ওঠেন ব্রহ্মহত্যার পাপী। মুক্তি পেতে তিনি বছরব্যাপী কাপালিক সন্ন্যাসী রূপে ভিক্ষা করেন।
৩. নীলকণ্ঠের ব্যথা: বিষ পান নয়, অভিমানও
সমুদ্র মন্থন থেকে উঠে আসে কালকূট বিষ। বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতা শিবের শরণে যান।
শিব সেই বিষ গিললেও তা গলায় আটকে রাখেন—তিনি হয়ে ওঠেন নীলকণ্ঠ।
কিন্তু এক লোককথা বলে, তাঁকে আগাম না জানিয়েই দেবতারা তাঁর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেন। অভিমানে তিনি কেলাস ছেড়ে গুহায় চলে যান, এবং পার্বতীর তপস্যায় ফের কেলাসে ফিরে আসেন।
৪. নন্দীর জন্ম: কীভাবে গরুর শরীর পেল শিবভক্ত?
এক দম্পতি তপস্যা করে একটি বিশেষ সন্তানের কামনা করেন, যিনি শিবের সেবা করতে পারবেন। তাঁদের আশীর্বাদে জন্ম নেয় এক শিশুর, যার মাথা গরুর মতো। শিব তাঁকে আপন করে নেন এবং বলেন, 'তুই শুধু বাহন নয়, আমার অর্ধাঙ্গ।' সেই শিশুই পরে হয়ে ওঠে নন্দী।
৫. লোকশিব: বাংলার ‘ভোলা বাবা’ আর বিহারের ‘শিবালু’
পূর্ব ভারতে শিবের বেশ কয়েকটি লোকরূপ প্রচলিত। বাংলার গ্রামে তিনি ভোলা বাবা, কখনো ‘পাটকি পরা সন্ন্যাসী’, যিনি মাঠে মাঠে ঘোরেন, আর কৃষকের রক্ষণ করেন।
বিহারে শিব হন ‘শিবালু’, গ্রামের ঝাড়ফুঁক আর ওঝার দেবতা। তন্ত্রশাস্ত্রের আড়ালে এই শিব লোকবিশ্বাসে আশ্রিত হয়ে ওঠেন।
৬. শিব ও চণ্ডালিনী: এক নিষিদ্ধ প্রেম
একবার শিব এক চণ্ডাল কন্যার প্রেমে পড়েন—এই কাহিনী পাওয়া যায় এক প্রাচীন লোকমুখে।
এই প্রেম সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল না, কিন্তু শিব ঘোষণা করেন, 'ভক্তির যোগ্যতা রক্তে নয়, হৃদয়ে।'
চণ্ডালিনী পরে হন এক তান্ত্রিক দেবী, যিনি তন্ত্রযোগে শিবের অর্চনা চালিয়ে যান।
৭. মহাকাল: সময়ের ঊর্ধ্বে এক দেবতা
উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির নিয়ে পুরাণে বলা হয়, যখন দৈত্য দূষণ মন্দির ধ্বংস করতে আসে, তখন শিব স্বয়ং ‘মহাকাল’ রূপে অবতীর্ণ হন।
এই রূপে তিনি সময়েরও নিয়ন্তা, যার সামনে কালদেবতাও নতজানু। এই রূপেই তিনি রাত্রে পূজিত হন, কারণ সময়ের নিকট আলো-অন্ধকার সমান।
শিব শুধু পুরাণের চরিত্র নন, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির জীবন্ত সত্তা। লোককথা, তন্ত্র, সাধনা, প্রেম ও প্রলয়ের এক অদ্ভুত সমন্বয়-এই সব গল্পই আমাদের শেখায়, শিবের প্রকৃত রূপ বহুমাত্রিক।
এই গল্পগুলো হয়তো সকলেই জানেন না, কিন্তু এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হিন্দু ধর্মের গূঢ়তত্ত্ব, সহনশীলতা ও রহস্যময়তা।