বিদ্যার দেবী সরস্বতী- যাঁর আরাধনায় বসন্তের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে বাঙালির জীবন। সরস্বতীপুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে- দেবীর বাহন কেন হাঁস? আর বৈদিক যুগে কেন নীল সরস্বতীর আরাধনা করা হত?
পৌরাণিক সূত্র অনুযায়ী, পদ্মপুরাণ ও স্কন্দপুরাণে সরস্বতীকে প্রথমে নদীর দেবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের এক ভয়াবহ যুদ্ধে জন্ম নেয় ভাদবগ্নি নামক সর্বগ্রাসী অগ্নি। সেই আগুন থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে দেবী সরস্বতী নদীর রূপ নিয়ে সমুদ্রে প্রবাহিত হন এবং আগুনকে নিভিয়ে দেন। এই রূপেই তিনি ছিলেন বৈদিক যুগের ‘নীল সরস্বতী’- যাঁর আরাধনা তন্ত্রসাধনা ও জ্ঞানসিদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
অন্য এক ব্যাখ্যায়, বিষ্ণুর নাভি থেকে জন্ম নেওয়া ব্রহ্মা সৃষ্টির দায়িত্ব পেয়ে যে নিয়ম ও বিধান রচনা করেন, সেই সৃষ্টিশীল শক্তির মূর্ত রূপই হলেন সরস্বতী। তিনি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সময় ও প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক। এই কারণেই দেবী শুধুমাত্র ব্রহ্মার পত্নী নন, বরং জ্ঞানের চিরন্তন উৎস।
দেবীর চার হাতে থাকা প্রতীকগুলিও গভীর অর্থবহ- পুস্তক জ্ঞানের, জপমালা ধ্যানের, জল শুদ্ধতার আর বীণা ছন্দ ও সঙ্গীতের প্রতীক। আর তাঁর বাহন হাঁস? শাস্ত্রমতে হাঁস এমন এক প্রাণী, যে জল, স্থল ও আকাশ- তিন ক্ষেত্রেই বিচরণ করতে পারে। ঠিক যেমন সরস্বতী জ্ঞান, বাক ও সৃষ্টির সর্বত্র বিরাজমান। তাই হংস বা হাঁসই দেবীর বাহন।
রামায়ণেও দেবী সরস্বতীর প্রভাব অনস্বীকার্য। কুম্ভকর্ণের বাক নিয়ন্ত্রণ করে সত্যের জয় নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। বৈদিক যুগে দেবী ছিলেন নীল সরস্বতী, পরে দুর্গার কন্যা ও বাগদেবী রূপে পূজিত। যুগ বদলালেও জ্ঞানের দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা আজও অমলিন।
আজ সরস্বতীপুজো মানেই বই-খাতা, হাতেখড়ি, আর বসন্তের উচ্ছ্বাস। আড়ম্বর বাড়লেও দেবীর মূল তাৎপর্য- জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আরাধনা- আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জয় সরস্বতী মাতা।