শ্রীবিষ্ণু হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা। তিনি ত্রিমূর্তির একজন-ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, শিব প্রলয় ঘটান আর বিষ্ণু এই মহাবিশ্বকে পালন ও সংরক্ষণ করেন। বৈষ্ণব ধর্মে তিনি নারায়ণ ও হরি নামে পূজিত হন। নানা যুগে নানা অবতারে তিনি আবির্ভূত হয়ে ধর্মরক্ষা করেছেন।
শাস্ত্রে দেখা যায়-মহাসমুদ্রের মাঝে, সর্পরাজ শেষনাগের ফণায় শায়িত বিষ্ণু। দেবী লক্ষ্মী তাঁর পদসেবা করছেন। এই দৃশ্যটি শুধু এক পৌরাণিক বর্ণনা নয়, বরং গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। প্রশ্ন হল-কেন তিনি শেষনাগের উপর শায়িত থাকেন?
শেষনাগ কে?
শেষনাগকে ‘অনন্ত’, ‘আদিশেষ’ নামেও ডাকা হয়। তিনি সর্পরাজ, যিনি হাজার ফণায় মহাবিশ্বকে ধারণ করেন। পুরাণে বলা হয়, তিনি ঋষি কশ্যপ ও কদ্রুর সন্তান এবং শ্রীবিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। মহাপ্রলয়ের সময় শেষনাগ মহাসমুদ্রের উপর ভেসে থাকেন, আর তাঁর কুণ্ডলীতে শায়িত থাকেন বিষ্ণু।
কেন বিষ্ণু শেষনাগের উপর শায়িত?
শেষনাগের আরেক নাম অনন্ত। সময়ের মতোই তিনি অন্তহীন। বিষ্ণু তাঁর উপর শায়িত হয়ে বোঝান-সৃষ্টি যেমন অনন্ত, তিনিও অনন্ত।
শেষনাগ মহাবিশ্বের ভার বহন করেন তাঁর অসংখ্য ফণায়। তিনি অটল স্থিতিশীলতার প্রতীক। বিষ্ণু তাঁর উপর শায়িত থেকে জানান-মহাবিশ্ব স্থিতিশীল রয়েছে তাঁর অনুগ্রহে।
শেষনাগ সময়ের প্রতীক। তাঁর অসংখ্য ফণা মানে অসীম মুহূর্ত। বিষ্ণু তাঁর উপর শায়িত থেকে জানান-তিনি সময়ের ধারক ও নিয়ন্ত্রক।
শেষনাগ-শয়ন আসলে যোগনিদ্রা। এখানে বিষ্ণু পরম ধ্যানস্থ অবস্থায়। এর দ্বারা বোঝানো হয়-তিনি মহাজ্ঞান ও মহাচেতনার আঁধার।
শেষনাগ সৃষ্টির আদিম শক্তি। তাঁর কুণ্ডলীতে শায়িত থেকে বিষ্ণু নতুন সৃষ্টির সূচনা করেন। মহাপ্রলয়ের সময়ও তিনি একই ভঙ্গিতে বিশ্রাম নেন। অর্থাৎ সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সবই বিষ্ণুর লীলা।
প্রতীকী অর্থ
শেষনাগ - সময়, অনন্ত, স্থিতিশীলতা।
সমুদ্র - অসীম মহাবিশ্ব।
বিষ্ণুর যোগনিদ্রা - সৃষ্টির পূর্বাবস্থা।
লক্ষ্মী - শক্তি ও সমৃদ্ধি।
সব মিলিয়ে বোঝা যায়- শ্রীবিষ্ণুর শেষনাগ-শয়ন আসলে মহাবিশ্বের জন্ম, স্থিতি ও প্রলয়ের প্রতীক।
শ্রীবিষ্ণুর শেষনাগ-শয়ন কোনও সাধারণ পৌরাণিক চিত্র নয়। এটি মহাবিশ্বের গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। এখানে অনন্তকাল, সময়ের প্রবাহ, যোগনিদ্রা ও মহাচেতনার দর্শন লুকিয়ে আছে। তাই আজও যখন আমরা বিষ্ণুকে শেষনাগের উপর শায়িত দেখি, তখন মনে হয়- মহাবিশ্ব অনন্ত, সময় চিরন্তন, আর সেই সবকিছুর নিয়ন্তা হলেন শ্রীবিষ্ণু।