শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডেঙ্গির বাহক এডিস এখন গ্রামাঞ্চলেও ঘাঁটি গেড়েছে। জলপাইগুড়ির মাল থেকে খাস কলকাতা, সর্বত্র নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে এডিস। রাশ আলগা হলেই বিপদ অবশ্যম্ভাবী। এমতাবস্থায় রাজ্যের প্রতি জেলায় বিশেষ নজরদারি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। পাশাপাশি নেপথ্যে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও পুরবোর্ডের তথৈবচ অবস্থা জড়িয়ে বলেও মনে করছে কেউ কেউ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলি কোমর বেঁধে না নামলে এডিসের বাড়বাড়ন্ত বাগে আনা মুশকিল। এই আশঙ্কার একটি বড় কারণ, রাজ্যের সাতটি পুরনিগম, ১১৯টি পুরসভার প্রায় কোথাও কোনও নির্বাচিত বোর্ড নেই। কাউন্সিলরদের দেখা নেই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। ৩৩৯০টি গ্রাম পঞ্চায়েতেরও তথৈবচ অবস্থা। পঞ্চায়েত প্রধানেরা কার্যত নিখোঁজ। যার কারণে অবহেলায় ধুঁকছে রাজ্যের সিংহভাগ এলাকা।
স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্য আধিকারিকদের সূত্রে খবর, প্রতি বছর লার্ভা নিধনের কাজে জেলায় জেলায় জনপ্রতিনিধিরাই কার্যত নোডাল অফিসারের কাজ করতেন। ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল, 'ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোলে'র অন্তর্গত স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন। এলাকার কোথায় লার্ভা রয়েছে তার খোঁজ এই স্বাস্থ্যকর্মীরাই দেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় পরবর্তী রণকৌশল। এতদিন ওয়ার্ডে, পঞ্চায়েতে ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে কোনও রকম সমস্যা তৈরি হলে কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধানদের সঙ্গেই যোগাযোগ করতেন স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা। কিন্তু বর্তমানে পুরসভা গুলোর অচলাবস্থায় এই কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছ।
স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্ট বলছে, এ বছর জলপাইগুড়ি, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, নদিয়ার যে সকল এলাকায় ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গিয়েছে সেখানে সংক্রমণের মূলে রয়েছে পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোলা, আবর্জনা। চিকিৎসকদ থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের মধ্যে এ বছর ডেন-২’এর আধিক্য বেশি। একেবারে গোড়ায় সতর্ক না হলে ডেন-২ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত যে সকল ব্যক্তি দ্বিতীয় বার ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের জন্য ডেন-২ হল মারাত্মক। স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এ বছর শীত আসতে দেরি হতে পারে। তাই নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গির প্রকোপ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে বক্তব্য স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের।
কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, খাস কলকাতায় অবস্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকেরা ‘আয়ুষ্মান ভারতে’র তথ্য আপলোডের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আর উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই তথ্য যাচাইয়ের কাজ করছেন আশা কর্মীরা। জেলার পুরসভাগুলিতে দিনভর একই কাজ করছেন সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা। ফলে বাড়ি বাড়ি জ্বরের খোঁজ রাখার পাশাপাশি ডাবের খোলা, টায়ার,পরিত্যক্ত পাত্রে থাকা জমা জলে মশার বংশবৃদ্ধির পরিস্থিতির উপরে যাঁরা নজর রাখতেন তাঁদের দেখা মিলছে না!
প্রশ্ন হল, এ বার কী হবে?
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘প্রতিটি পুরসভায় প্রশাসক তো একজনই। তাঁর একার পক্ষে জনপ্রতিনিধিদের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব? গত দশ বছরে ডেঙ্গি মোকাবিলা করতে করতে জনপ্রতিনিধিরাও জানতেন কোন পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ করতে হবে। প্রশাসকদের কি সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে?’’ চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে তা মেনেই স্বাস্থ্যভবনের এর দাবী, ‘‘পুরবোর্ডগুলি না থাকলেও কাউন্সিলরদের কাজ এখন বিধায়কেরা তো করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে বিধাননগর পুরনিগম, নবদিগন্ত, দক্ষিণ দমদম পুরসভার কাজ দেখছে । বিজেপির ২০৭ জন বিধায়ক রয়েছে। আশা করা হচ্ছে কোথাও কোনও অসুবিধা হবে না।’’