মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হল নিয়ানডারথাল মানুষের বিলুপ্তি। আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স যখন পৃথিবীতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তখনই ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে প্রাচীন মানবপ্রজাতি নিয়ানডারথালদের সংখ্যা। তবে ঠিক কী কারণে এই প্রজাতি পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সম্প্রতি জার্মানিতে আবিষ্কৃত ৫৫ হাজার বছরের একটি ভ্রূণের হাড় এই রহস্যের নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ জার্মানির সেসেলফেল্সগ্রোট রক শেল্টার এলাকায় খননের সময় বিজ্ঞানীরা কয়েকটি ছোট ছোট মানুষের হাড় খুঁজে পান। প্রথমে এগুলির গুরুত্ব বোঝা যায়নি। পরে গবেষণায় জানা যায়, এগুলি আধুনিক মানুষের নয়, বরং নিয়ানডারথাল প্রজাতির ভ্রূণের হাড়। ফিমার, ফিবুলা, খুলির অংশ ও পাঁজরের ক্ষুদ্র হাড়ের টুকরো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানান, এগুলি সম্ভবত জন্মের আগের বা জন্মের ঠিক পরের অবস্থায় থাকা একটি নিয়ানডারথাল ভ্রূণের।
গবেষণায় ভ্রূণটির মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি ইউরোপের শেষদিকের নিয়ানডারথালদের থেকে কিছুটা আলাদা এবং আরও প্রাচীন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথালদের জনসংখ্যা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। এর ফলে তাদের জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায় এবং প্রজাতিটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞানীদের মতে, তুষার যুগের তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনও এই সংকটের বড় কারণ ছিল। কঠিন আবহাওয়ার কারণে শিকার ও খাদ্যের উৎস কমে যায়। ফলে তাদের বাসস্থান ও বেঁচে থাকার সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। অবশেষে ৪৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথালদের সংখ্যা দ্রুত কমে গিয়ে প্রজাতিটি প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তবে তার আগেই নিয়ানডারথালদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রজনন ঘটেছিল। তাই আজও পৃথিবীর অনেক মানুষের জিনে নিয়ানডারথালের কিছু জিনগত চিহ্ন রয়ে গেছে। প্রাচীন এই ভ্রূণের আবিষ্কার তাই মানব বিবর্তনের ইতিহাসে নতুন আলো ফেলছে।