গভীর রাত। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো বুকের ওপর বিশাল কোনো পাথর চেপে বসেছে। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা নেই, মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করা যাচ্ছে না। সেই মুহূর্তে দেখতে পেলেন ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে। এরপর আপনার শরীর অসাড় হয়ে যেতে শুরু করল। ভুলেও ভাববেন না যে ভূতের গল্প বলছি । ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখে প্রচলিত একটি কথা ছিল বোবায় ধরা। ঘুমের মধ্যে যাঁদের গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যায়, বলা হয় যে তাঁদের বোবায় ধরেছে। ওই সময়ে ঘুমের মধ্যেই যেন মনে হয় হাতপা আড়ষ্ট হয়ে আসছে, অসাড় হয়ে যায় শরীর, দমবন্ধ হয়ে আসতে থাকে, মনে হয় কেউ যেন গলা চেপে ধরছে। আর শরীরের এই জটিল পরিস্থিতি তৈরী হয় একটি স্নায়বিক অসুখ থেকে যার নাম, ‘স্লিপ প্যারালিসিস’।
ঘুম ও জেগে থাকার মাঝামাঝি একটা পর্যায়ে যখন মস্তিষ্ক খুব সজাগ থাকে, সে সময়ে শরীর হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয় । পেশিশক্তি কমতে থাকে, মস্তিষ্ক থেকে সঙ্কেত পেশিতে ঠিক মতো পৌঁছোতে পারে না, তখন পেশির অসাড়তা দেখা যায়। অনেকের আবার এই সময়ে দৃষ্টিবিভ্রমও হয়। কথা বলার শক্তি থাকে না। কেবল মুখ থেকে শুধু অস্ফুটে কিছু গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী হয় এই অবস্থা। এই অসঙ্গতি সামাল দিতে না পেরে ভয়ার্ত মস্তিষ্ক তখন চোখের সামনে হ্যালুসিনেশন বা অলীক ছায়ামূর্তি তৈরি করে, যা মানুষ বাস্তবে দেখছে বলে ভুল করে। ভূত দেখার পেছনের আরেকটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো 'প্যারেডোলিয়া' (Pareidolia)। মানুষের প্রাচীন বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমাদের মস্তিষ্ক যেকোনো এলোমেলো অবয়বের মধ্যে মানুষের মুখ বা চেনা কোনো আকৃতি খোঁজার চেষ্টা করে। চাঁদের কলাগাছ বা মেঘের মধ্যে পশুপাখির অবয়ব দেখার কারণ এটাই। ঠিক একইভাবে, রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে ঝুলে থাকা কালো কোট, আলনায় রাখা কাপড় কিংবা গাছের ডালপালার নড়াচড়াকে আমাদের মস্তিষ্ক অবচেতন ভয়ের কারণে 'ভূত' বা 'ছায়াশরীর' বলে ধরে নেয়।
এর পাশাপাশি ঘরের পরিবেশও মানুষের মনে অলৌকিক অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অনেক সময় পুরোনো বা পরিত্যক্ত বাড়িতে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বা কার্বন মনোক্সাইডের সূক্ষ্ম মাত্রা মানুষের মস্তিষ্কে এক ধরণের হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। এছাড়াও, বিজ্ঞানে প্রমাণিত যে ৭ থেকে ১৯ হার্টজের 'ইনফ্রাসাউন্ড' (Infrasonic Waves) বা অতি-নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গ (যা মানুষের কান শুনতে পায় না) মানুষের শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি, অস্বস্তি এবং চোখের মণি কম্পনের মাধ্যমে ছায়ার মতো অবয়ব দেখার বিভ্রম তৈরি করতে পারে। পুরোনো বড় বাড়ির হাওয়া চলাচলের শব্দ কিংবা কারখানার ভারী ইঞ্জিনের কম্পন থেকে এই ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি হতে পারে।
সুতরাং, যে অলৌকিক গল্পগুলো আমাদের যুগের পর যুগ তাড়া করে বেরায়, আধুনিক নিউরোসায়েন্স ও মনস্তত্ত্বের আলোয় তা আসলে মস্তিষ্কের এক একটি জটিল রাসায়নিক সমীকরণ মাত্র। ভয় যখন আমাদের যুক্তিকে গ্রাস করে, তখনই বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে 'হ্যালুসিনেশন' বলা হয়, সাধারণ মানুষ তাকেই 'ভূতের উপদ্রব' বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, ভয়ের আড়ালে থাকা এই রহস্যময় কুয়াশা কোনো অভিশপ্ত স্থানে নয়, বরং মানুষের মগজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা এক রোমাঞ্চকর ধাঁধা।