দিল্লির ভয়াবহ দূষণ কমাতে আজ যখন কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম বৃষ্টির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তখন ইতিহাস ঘেঁটে উঠে আসছে এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম। প্রায় সাত দশক আগে কলকাতার বুকে সফলভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি নামিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ড. সুধাংশু কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (Dr. Sudhanshu Kumar Banerji)। বিজ্ঞানমহলে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘মেঘ ব্যানার্জি’ নামে।
১৯৫২ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সীমিত সরঞ্জাম আর অদম্য কৌতূহলকে সঙ্গী করেই শুরু হয়েছিল তাঁর যুগান্তকারী পরীক্ষা। নিজেই তৈরি করেছিলেন বিশাল এক কাচের ঘর, যেখানে মেঘের পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চালাতেন। প্রায় দু’বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর তিনি খোলা আকাশে পরীক্ষা শুরু করেন।
সিলভার আয়োডাইড এবং ড্রাই আইস ব্যবহার করে মেঘের মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটানোর পর অল্প সময়ের মধ্যেই নেমে আসে বৃষ্টি। সেই সময়ের ভারতের পক্ষে যা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য সাফল্য। তাঁর এই গবেষণার ফল পরে 'Artificial Rainfall' নামে প্রকাশিত হয় এবং বিজ্ঞানমহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলে।
ড. বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু আবহাওয়াবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ ও উদ্ভাবকও। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি কাজ করেছিলেন নোবেলজয়ী সি.ভি. রমন (C. V. Raman)-এর গবেষণা সহকারী হিসেবে। পরে ভারতের আবহাওয়া দফতরের প্রথম ভারতীয় জেনারেল ডিরেক্টর হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিদেশি যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় তিনি নিজেই দেশীয় প্রযুক্তিতে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘Order of the British Empire’ সম্মানে ভূষিত করে।
আজ যখন ক্লাউড সিডিং নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন ড. সুধাংশু কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজ আবার মনে করিয়ে দেয়- বিজ্ঞান শুধু আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে না, সাহস, কল্পনা আর অধ্যবসায়ও ইতিহাস তৈরি করতে পারে। কলকাতার আকাশে যে স্বপ্ন একদিন বৃষ্টি হয়ে নেমেছিল, আজ সেই পথেই হাঁটছে গোটা দেশ।