Calcutta Television Network

জাতিঙ্গা: পাখিদের রহস্যময় আত্মহত্যার উপত্যকা

জাতিঙ্গা: পাখিদের রহস্যময় আত্মহত্যার উপত্যকা

17 August 2026 , 07:19:19 pm

ভারতের উত্তরপূর্বের অসম রাজ্যের ডিমা হাসাও জেলার একটি গ্রাম জাতিঙ্গা। যেখানে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত, আত্মহত্যা করতে আসে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও,বছরের এই তিনমাস নির্দিষ্ট সময়ে,পরিযায়ী পাখিরা এই গ্রামের নিদির্ষ্ট একটি এলাকায় এসে নিজেকে মৃত্যুমুখে নিয়ে যায়। অনেক বছর ধরে চলে আসা এই  ঘটনাকে কেউ বলেছেন, ভূত-প্রেত বা কোনও অশরীরীর অভিশাপ, আনবার যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্কদের কাছে এটি নিছকই বায়লোজিক্যাল ক্র্যাশ। 

শান্ত এবং সবুজে ঘেরা পাহাড়ি গ্রাম জাতিঙ্গা। আপাতদৃষ্টিতে ছবির মতো সুন্দর এই গ্রামটি, বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানী ও পাখি বিশেষজ্ঞদের কাছে এক বিস্ময় ও আতঙ্কের নাম। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে এই গ্রামে ঘটে এক অদ্ভুত ও রোমহর্ষক ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে এই স্থানটিকে পাখিদের আত্মহত্যার উপত্যকা হিসেবে পরিচিত করেছে । পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণ কিন্তু বছরের প্রতিদিন দেখা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় কিছু নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক পরিস্থিতির। সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন, মেঘলা এবং চাঁদহীন অন্ধকার রাতে, যখন উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মৃদু বাতাস বইতে শুরু করে, তখনই পাখিরা এই অদ্ভুত আচরণ করে। সাধারণত সন্ধে ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে বনের শত শত পাখি আচমকা উড়ে এসে গ্রামের আলোর উৎসগুলোর দিকে ধাবিত হয়। তারা আলো দেখে এতটাই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, তীব্র গতিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটি, গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে নিচে আছড়ে পড়ে। মাটিতে পড়ার পর তারা আর ওড়ার চেষ্টা করে না, সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। অতীতে জটিঙ্গার আদিবাসী জেমে নাগা-রা বিশ্বাস করত, আকাশ থেকে নেমে আসা এই পাখিরা আসলে ভূত বা অপদেবতার রূপ। ১৯০৫ সালের দিকে তারা প্রথম এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তীব্র আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে জেনটিয়া উপজাতির মানুষ এই গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে। তারা এই ঘটনাকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করত এবং আলো জ্বালিয়ে নিচে পড়ে যাওয়া পাখিদের খাবার হিসেবে সংগ্রহ করত। অবশ্যদীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয়দের ধারণা ছিল, কোনো অলৌকিক অভিশাপের কারণেই পাখিরা এখানে এসে আত্মহত্যা করে।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলে,পাখিরা আসলে স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করে না। বিখ্যাত ভারতীয় পক্ষীবিদ ড. সালিম আলী সহ দেশ-বিদেশের বহু বিজ্ঞানী জাতিঙ্গা সফর করে এর একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্ষার শেষে ঘন কুয়াশা এবং মেঘের কারণে পাখিরা আকাশের তারা বা চাঁদ দেখে দিক নির্ণয় করতে পারে না। একই সাথে জটিঙ্গা উপত্যকার মাটির নিচে থাকা ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের কোনো পরিবর্তনের কারণে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে পাখিদের অভ্যন্তরীণ দিক চেনার ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এই অবস্থায় উত্তর-পূর্ব দিকের তীব্র বাতাস পাখিদের তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান থেকে উড়িয়ে উপত্যকার দিকে নিয়ে আসে। কুয়াশার মধ্যে দিকহারা পাখিরা যখন গ্রামের উজ্জ্বল আলো দেখতে পায়, তখন তারা সেটিকে একমাত্র আশ্রয় মনে করে সেদিকে তীব্র গতিতে ছুটে আসে এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, দূর-দূরান্তের পরিযায়ী পাখি নয়, বরং জাতিঙ্গার আশেপাশের বনের স্থানীয় পাখিরাই এই ঘটনার শিকার বেশি হয়। 

একসময় আলোর ফাঁদ পেতে গ্রামবাসীরা যেভাবে পাখিদের হত্যা করত, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার প্রচেষ্টায় আজ তা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। জাতিঙ্গায় এখন সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামবাসীদের বোঝানো হয়েছে যে, পাখিরা আত্মহত্যা করে না, বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়। এখন গ্রামে হাই-ভোল্টেজ আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পাখিদের সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে । প্রকৃতির এই অমীমাংসিত রহস্যকে কাছ থেকে দেখতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ও গবেষক জাতিঙ্গায় ভিড় জমান। বিজ্ঞান অনেক ব্যাখ্যা দিলেও, ঘন কুয়াশায় ঢাকা রাতে কেন শুধু এই নির্দিষ্ট গ্রামটিতেই পাখিরা এভাবে আছড়ে পড়ে, সেই রহস্যের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আজও প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে রয়েছে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN