জেমস ওয়েব ও হাব্ল স্পেস টেলিস্কোপের পর মহাকাশ গবেষণায় আরও একটি নতুন পদক্ষেপ নিতে চলেছে নাসা। এবার মহাকাশে পৌঁছে যাচ্ছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। এই নতুন টেলিস্কোপের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল, মহাবিশ্বের সেই রহস্যময় অংশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, যা মানুষের চোখে বা সাধারণ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে কার্যত ধরাই পড়ে না। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ অংশ দৃশ্যমান। গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ, ছায়াপথ-সহ যে সমস্ত মহাজাগতিক বস্তু আমরা দেখতে পাই, সেগুলিই এই অংশের মধ্যে মূলত পড়ে। বাকি অংশের বৃহৎ ক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। এই দুই অজানা ক্ষেত্র এখনও গবেষকদের কাছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলির অন্যতম। ডার্ক ম্যাটারকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় না। কারণ, এটি আলো ছড়ায় না এবং আলো প্রতিফলিতও করতে অক্ষম। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে বিজ্ঞানীরা এর উপস্থিতির প্রমাণ পান। ছায়াপথের মধ্যে নক্ষত্রগুলিকে একসঙ্গে এক অদৃশ্য সুতোয় ধরে রাখতে ডার্ক ম্যাটারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। দূরের কোনও ছায়াপথ থেকে আসা আলো মাঝপথে মহাকর্ষের প্রভাবে বাঁকা হয়ে গেলে সেই ঘটনাও বিজ্ঞানীদের ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে বিস্তর ধারণা দেয়। অন্য দিকে, ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই অজানা শক্তির কারণেই ব্রহ্মাণ্ড ক্রমশঃ দ্রুত গতিতে আরও বৃহৎ হয়ে চলেছে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়েই রয়েছে এই সুবিশাল অজ্ঞাত ডার্ক এনার্জি।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নতুন টেলিস্কোপটির উৎক্ষেপণ করা হবে। ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযানের মাধ্যমে সেটিকে মহাকাশে পাঠানোর কথা রয়েছে। এই প্রকল্পে কয়েকশো কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে। তবে রোমান টেলিস্কোপের কাজ শুধু ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌরজগতের বাইরের নতুন গ্রহের সন্ধান, মহাকর্ষের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা এবং অসংখ্য ছায়াপথ পর্যবেক্ষণও করতে সক্ষম এটি। হাব্ল টেলিস্কোপের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মহাবিশ্বের নানা অজানা তথ্য প্রতিনিয়ত সামনে এসেছে। পরবর্তীতে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আরও দূরবর্তী এবং প্রাচীন মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরিতে সক্ষম হয়। এ বার সেই গবেষণার ধারাকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে নবাগত রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। বিজ্ঞানীদের আশা, আগামী দিনে প্রায় ২০০ কোটির বেশি ছায়াপথ নিয়ে সমীক্ষা চালাবে এই টেলিস্কোপ। সেই তথ্য থেকে ছায়াপথ ও নক্ষত্রের জন্ম, তাদের কক্ষপথ পরিবর্তন এবং মহাবিশ্বের প্রসারণ সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আর সেই গবেষণাই হয়তো একদিন উন্মোচন করবে মহাবিশ্বের সর্বাপেক্ষা অন্ধকার ও অজানা দুই রহস্য, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির প্রকৃত পরিচয়। ব্রহ্মাণ্ড রহস্যর পর্দা উন্মোচন হয়ত মানব জগতের সম্মুখে সময়ের অপেক্ষামাত্র।