মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে বহুদিন ধরেই একটি প্রচলিত ধারণা ছিল- মৃতদেহকে সমাধি দেওয়া শুরু করেছিল আধুনিক মানুষই। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সেই ধারণাকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার বলছে, আধুনিক মানুষের বহু আগে এক প্রাচীন মানবপ্রজাতিই মৃতদের সমাধিস্থ করার প্রথা শুরু করেছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার রাইজ়িং স্টার কেভ অঞ্চলে সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সমাধিস্থলের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। এই গুহা অঞ্চলটি জোহানেসবার্গ থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বহু বছর ধরেই এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
গবেষকদের দাবি, এখানে যে কবরগুলি পাওয়া গেছে, সেগুলি আধুনিক মানুষ নয় বরং প্রাচীন মানবপ্রজাতি হোমো নালেদি তৈরি করেছিল। এই প্রজাতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- এদের মস্তিষ্কের আকার ছিল আধুনিক মানুষের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অনেকটা কমলালেবুর মতো ছোট। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত ছোট মস্তিষ্ক থাকা সত্ত্বেও তারা মৃতদেহকে পরিকল্পিতভাবে সমাধিস্থ করত।
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার নেতৃত্ব দেন লি বার্জার, যিনি উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রত্নতাত্ত্বিক। ২০১৩ সালে তাঁর নেতৃত্বেই রাইজ়িং স্টার গুহায় খননকার্য শুরু হয়। সেই সময় গুহা থেকে প্রায় ১৫টি প্রাণীর দেড় হাজারেরও বেশি হাড়ের জীবাশ্ম উদ্ধার হয়, যেগুলি পরে হোমো নালেডি প্রজাতির বলে শনাক্ত করা হয়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, গুহার নির্দিষ্ট চেম্বারের ভেতরে মাটির স্তরের নীচে যত্ন করে রাখা হয়েছিল এই দেহাবশেষ। বিশ্লেষণে এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে মাটি স্বাভাবিকভাবে ধসে পড়ে দেহগুলিকে ঢেকে দিয়েছে। বরং মনে করা হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ত খুঁড়ে মৃতদেহ রাখা হয়েছিল এবং পরে তা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। ফলে গবেষকেরা নিশ্চিত, এটি একটি পরিকল্পিত সমাধিস্থল।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হল, গুহার কিছু দেয়ালে জ্যামিতিক নকশার খোদাই পাওয়া গেছে। এগুলি ইঙ্গিত দেয় যে হোমো নালেডিরা শুধু সমাধি দিতই না, বরং প্রতীক বা চিহ্ন তৈরি করার ক্ষমতাও রাখত। গবেষক আগস্টিন ফুয়েন্তেস মনে করেন, যদি এই প্রমাণ আরও শক্তিশালী হয়, তবে মানববিবর্তনের ধারণা নতুনভাবে ভাবতে হবে।
এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসের একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে- বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই শুধু মস্তিষ্কের আকারের উপর নির্ভর করে? ছোট মস্তিষ্কের এই আদিমানবেরা যদি সমাধি তৈরি করতে পারে, তবে মানব সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা হয়তো নতুন করে লিখতে হবে।