মানবসভ্যতার ইতিহাসে লেখালিখির সূচনা হয়েছিল প্রায় ৫,৩০০ বছর আগে। মেসোপটেমিয়ার সভ্যতায় জন্ম নেয় কিউনিফর্ম লিপি, আর প্রায় একই সময় মিশরে দেখা যায় মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, মানুষের যোগাযোগের জন্য চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করার ইতিহাস আরও অনেক পুরনো, সম্ভবত ৪০,০০০ বছর আগেও মানুষ লেখার মতো কোনও পদ্ধতির চেষ্টা করছিল।
সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির স্বাবিয়ান জুরা অঞ্চলে এমন কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে। এখানে পাওয়া শিং, হাড়, হাতির দাঁত এবং অন্যান্য বস্তুতে খোদাই করা রয়েছে অসংখ্য জ্যামিতিক চিহ্ন- রেখা, খাঁজ, বিন্দু এবং ‘ক্রস’-এর মতো নকশা।
এই গবেষণাটি করেছেন সারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান বেন্টজ এবং বার্লিন মিউজ়িয়ামের প্রত্নতাত্ত্বিক ইভা ডুটকিউইচ। তাঁরা প্রায় ২৬০টি প্রাচীন শিল্পবস্তু বিশ্লেষণ করে প্রায় ৩০০০টি চিহ্ন শনাক্ত করেছেন। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান জার্নাল Proceedings of the National Academy of Sciences-এ।
গবেষকদের মতে, এই চিহ্নগুলি আধুনিক লেখার মতো নয়। তবে এগুলির মধ্যে এমন কিছু জটিলতা ও বিন্যাস দেখা যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে Proto‑Cuneiform বা কিউনিফর্মের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বস্তুগুলির আকারের তুলনায় খোদাই করা চিহ্নগুলির ঘনত্ব অনেক বেশি- যেন এই প্রতীকগুলিই ছিল আসল বার্তা বহনের মাধ্যম।
এই চিহ্নগুলির মাধ্যমে ঠিক কী বোঝানো হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, নকশাগুলির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ বা ধারাবাহিকতা রয়েছে- যেমন পরপর কয়েকটি রেখা বা একাধিক ‘ক্রস’ চিহ্ন। কোথাও কোথাও আবার প্রাণী বা মানুষের আকৃতি খোদাই করার চেষ্টা দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, প্রাণীর ছবির পাশে ‘ক্রস’ চিহ্ন পাওয়া গেলেও মানুষের চিত্রের সঙ্গে তা কখনও ব্যবহার করা হয়নি- যা হয়তো কোনও সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
এই সময়কালটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ তখন ইউরোপে ইতিমধ্যেই আধুনিক মানুষ, অর্থাৎ Homo sapiens পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে অনেক গবেষকের ধারণা, এই চিহ্নগুলির স্রষ্টা সম্ভবত আধুনিক মানুষই।
যদিও এই রহস্যময় প্রতীকগুলির প্রকৃত অর্থ এখনও অজানা, তবু প্রত্নতত্ত্ববিদদের একাংশ মনে করছেন- এগুলি নিছক আঁকিবুকি নয়, বরং তথ্য বা বার্তা প্রকাশের প্রাচীনতম প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, লেখালিখির ইতিহাস হয়তো আমাদের ধারণার থেকেও হাজার হাজার বছর বেশি পুরনো।