Calcutta Television Network

শৈশবের ধুলোমাখা সাতকাহন:হারিয়ে যাওয়া খেলার খোঁজে

শৈশবের ধুলোমাখা সাতকাহন:হারিয়ে যাওয়া খেলার খোঁজে

12 August 2026 , 04:32:37 pm

যে সময়ের কথা,তখন বিকেলের সোনাঝুরি রোদ একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসতো,আর স্কুল ফেরত বাচ্চাগুলি দিতো গোল্লা ছুট। ধুলো ওড়া মাঠ,জল ভর্তি পুকুর,আম,জাম বা বটের ঝুড়ি কোনও জায়গাই বাদ রাখতো না তারা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো জ্বলে ওঠার আগে পর্যন্ত যে সময়টুকু ছিল,তা এক মায়াবী জগতের। সেখানে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না, ছিল না আজকালকার মতো স্ক্রিনের হাতছানি। ছিল শুধু একমুঠো ধুলোবালি,কয়েকটা ভাঙা মাটির চাড়,একটা ডান্ডা বা গুলি,একটা নেকড়ার বল আর বুকভরা নিখাদ আনন্দ। আজ সেই চেনা বিকেলগুলো কেমন যেন গুমরে মরে বহুতল আবাসন আর এসির বদ্ধ ঘরে। বিশ্বায়ন কেড়ে নিয়েছে শৈশবের সেই পুরোনো চেনা ছন্দ,এই প্রজন্ম ভুলতে বসেছে পুরানো সেই দিনের খেলাধুলা। 

ডাংগুলির সেই সপাং শব্দ মনে পড়ে? মনে আছে সেই কাঠের ছোট্ট ডাণ্ডা আর দু-দিক ছুঁচলো করা গুলির কথা? গাছের ডাল কেটে তৈরি হওয়া সেই ডাংগুলি ছিল যেন গ্রাম বাংলার ক্রিকেট। গুলিটাকে বাতাসে ভাসিয়ে অন্য হাতের ডাণ্ডা দিয়ে সপাং করে আঘাত করার মধ্যে যে কী অপরিসীম বীরত্ব ছিল,তা আধুনিক জয়স্টিক বোঝাতে পারবে না। গুলি হারিয়ে গেলে ঝোপঝাড়ের মধ্যে খোঁজার সেই রোমাঞ্চ,কিংবা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বন্ধুদের খিলখিল হাসি—সবটাই আজ স্মৃতিপটেই বন্দি। শৈশবের আরও এক টানটান উত্তেজনার নাম ছিল 'পিট্টু' বা 'সাতচাড়া'। একের ওপর এক,সাতটি চ্যাপ্টা পাথর বা মাটির কলসির ভাঙা টুকরো সাজিয়ে রাখা হতো। দূর থেকে কাপড়ের বল ছুড়ে সেই স্তূপ ভেঙে দেওয়ার পর শুরু হতো আসল যুদ্ধ। এক দল যখন সেই পাথরগুলো আবার আগের মতো সাজাতে ব্যস্ত,অন্য দল তখন বল দিয়ে তাদের পিঠে আঘাত করার জন্য তৈরি। সেই বলের আঘাত এড়ানোর হুটোপুটি আর শেষ মুহূর্তে পিট্টু সাজিয়ে ‘উইন’ বলে চিৎকার করার যে আনন্দ,তা বোধহয় কোনও কম্পিউটার গেম দিতে পারে না। ভর দুপুরের কড়া রোদকে উপেক্ষা করে, বড়দের চোখরাঙানি এড়িয়ে যারা পকেটে একরাশ কাচের মার্বেল নিয়ে ঘুরত,তারা ছিল পাড়ার একেকজন মাস্তান। মাটির ওপর ছোট্ট একটা গর্ত, যাকে বলা হতো 'ঘ্যাঁত'। নিখুঁত নিশানায় বুড়ো আঙুলের টোকায় অন্য মার্বেলকে আঘাত করা,যেকোনো বড় লক্ষ্যভেদের চেয়ে কম ছিল না। রোদের আলোয় সেই রঙিন কাচের মার্বেলগুলোর দিকে তাকালে মনে হতো, যেন এক একটা আস্ত ছোট আকাশ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কুমির ডাঙ্গা,হাডুডু,কিতকিত,কানামাছি,ইচিং বিচিং,ষোলো গুটি,লাটিম লড়াই,এক এক করে জায়গা করে নিয়েছে স্মৃতির পাতায়। 

আজকের শৈশব বড্ড বেশি হিসেবী,বড্ড বেশি চার দেওয়াল আর ফোনে-কম্পিউটার স্ক্রিনে বন্দি। খেলাধুলা চরিত্র গঠন করে,গঠন করে মানসিক দৃঢ়তা,যা জীবনে চলার প্রতি পদে কাজে লাগে। অনলাইন গেমের গ্রাফিক্সে রক্তারক্তি আছে কিন্তু বন্ধু পড়ে গেলে,হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সেই মানবিক টানটুকু নেই। গেমের 'লাইফ' রিচার্জ করা যায়,কিন্তু ধুলোমাখা সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলোকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। হেরিটেজ সংরক্ষণের যুগে আমাদের এই নিজস্ব খেলাগুলোও কি এক একটা জীবন্ত হেরিটেজ নয়? হয়তো সময় এসেছে, ল্যাপটপ-মোবাইল সরিয়ে রেখে আগামী প্রজন্মের হাতে আবার একটা লাটিম বা ডাংগুলি তুলে দেওয়ার। আরও একবার ধুলো মাখার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া বড্ড প্রয়োজন,অন্তত ওদের স্বার্থে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN