আষাঢ়-শ্রাবণে মেঘ গুড়গুড় করলেই বাঙালির রক্তে জেগে ওঠে ফুটবল । একদিকে জানলার বাইরে রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ, আর অন্যদিকে আলমারির কোণ থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে চামড়ার ফুটবলটা বের করে আনার এই দৃশ্য, বাংলার এক চিরায়ত আবেগের কোলাজ। ক্রিকেট যতই আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়া শাসন করুক না কেন, বাংলার বর্ষাকাল মানেই আজও ফুটবল। বৃষ্টিভেজা কাদা-মাঠে গোড়ালির টোকায় বল এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে আনন্দ, তা বোধহয় পৃথিবীর কোনো নামী স্টেডিয়ামের কৃত্রিম ঘাসও দিতে পারে না। বৃষ্টি আর ফুটবল যেন এই পলিমাটির দেশে একে অপরের পরিপূরক, যেখানে মেঘের গর্জন আর গ্যালারির চিৎকার মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
বাংলার ফুটবলের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, আইএফএ শিল্ড থেকে শুরু করে কলকাতা ময়দানের অনেক বড় ম্যাচের ঐতিহাসিক লড়াইগুলো জমে উঠেছিল এই ঘোর বর্ষাতেই। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের খালি পায়ে,বুট পরা ব্রিটিশদের হারিয়ে শিল্ড জয়ের সেই রূপকথাও লেখা হয়েছিল এক মেঘলা, কর্দমাক্ত বিকেলে। ময়দানের প্রবীণ ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায় আজও কান পাতলে শোনা যায় পিকে ব্যানার্জী, চুনী গোস্বামী কিংবা সুব্রত ভট্টাচার্যের জামানায় কাদা-মাঠের সেই মরণপণ লড়াইয়ের গল্প। বল কাদার মধ্যে আটকে গেলে কীভাবে কৌশলে তা চিপ করে ওপরে তুলে পাস দিতে হতো, সেইসব টেকনিক্যাল আলোচনা আজও চায়ের দোকানে ঝড় তোলে।
ময়দানের গ্ল্যামারাস ম্যাচগুলোর বাইরে, বাংলার আসল ফুটবলের স্পন্দন কিন্তু লুকিয়ে থাকে গ্রাম-বাংলার মাঠে। বর্ষার মরশুমে যখন চাষের জমিতে জল জমে, তখন গ্রামের কোনো স্কুল মাঠ কিংবা নদীর চরে বসে 'কাদা-মাঠের' টুর্নামেন্ট,খেপের খেলা । বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছাতা মাথায় দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ এখনও এসে দাঁড়ায় মাঠের ধারে। কোনো রেফারি বা নিখুঁত নিয়মের তোয়াক্কা না করে স্রেফ একটা গোলপোস্ট আর ফুটবলের পেছনে ছুটে চলা বিশ-পঁচিশটা ছেলের উন্মাদনা দেখতে জড়ো হয় গোটা গ্রাম। নব্বইয়ের দশকের এই ফুটবল উন্মাদনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত নস্টালজিয়া। খেলা শেষে, কাদা মেখে ভূত হয়ে বাড়ি ফেরা, সদর দরজায় মায়ের সেই চেনা বকুনি, কড়া শাসনে লুকিয়ে থাকতো যে স্নেহ, তা আজ বড়ো বেশি। স্নান শেষে, ভেজা চুল আর চাদর গায়ে জড়িয়ে জানলার ধারে বসে,বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যেয় মুড়ি-তেলেভাজা খাওয়ার সেই স্বাদ যেন আজও জিভে লেগে আছে। দূরদর্শনে তখন হয়তো চলছে কোনো ফুটবল ম্যাচের হাইলাইটস কিংবা কোনো বাংলা সিরিয়াল, কিন্তু মন পড়ে থাকত বিকেলের ওই কাদা মাঠের গোলটার কাছেই।
আজ কংক্রিটের ভিড়ে সেই চেনা মাঠগুলো হারিয়ে গেছে, বলের জায়গাও নিয়েছে ভিডিও গেম, কিন্তু নব্বইয়ের দশকের সেই বৃষ্টিভেজা কাদা মেখে ফুটবল খেলা আজও বাঙালির স্মৃতির সিন্দুকে এক সোনালী ট্রফি হয়ে রয়ে গেছে। আধুনিক যুগে কৃত্রিম টার্ফ আর ইনডোর গেমসের দাপট বাড়লেও, কাদা মেখে মাঠে ফুটবল খেলার যে আনন্দ, তা বাঙালির ডিএনএ থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।