ফুটবলের বিশ্বসেরার খেতাবের মূল লড়াইটা ছিল, তিকিতাকা ভার্সেস মেসি ম্যাজিক। একদিকে একদল প্রতিভাবান কিছু ছেলে, যাদের প্রত্যেকের আঠার মতো বল কন্ট্রোল ও ধৈর্য্যে। আর অন্য দিকে ছিল বিশ্ববিজয়ী প্রতাপ, যার সারথি স্বয়ং ফুটবলের বরপুত্র মেসি!
স্পেন যেভাবে ফ্রান্স কে বোতল বন্দি করেছিল, অতি বড়ো আর্জেন্টিনা সমর্থকও আন্দাজ করেছিল স্পেনের দুর্ভেদ্য ডিফেন্স চিড়ে গোল করাটা কতটা কঠিন হবে আজ।
পরিসংখ্যান বলছে, লা রোজা (স্পেন) ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে সব থেকে বেশি ম্যাচে অজেয় থাকার রেকর্ড স্পর্শ করার দ্বার -প্রান্তে দাঁড়িয়ে। সামনে শুধুই ইতালী (38 ম্যাচ অজেয়)। তাই একরাশ ভয়ের ও আশঙ্কার মেঘ ভাসছিলো বৈকি!
সেটাই সত্যি হলো। অসাধারণ স্প্যানিশ মাঝমাঠের কাছে রীতি মতো বলই পাচ্ছিলো না আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ যত গড়ালো, অসহায়তার সমুদ্রে খেই হারিয়ে ফেলল লিও বাহিনী। দিক শূন্য হয়ে যেভাবে ছটফট করে নাবিক, ঠিক সেই রকমই মেসির অবস্থা। একটাও বল পাচ্ছিল না সে, যে গোল মুখে শট নেবে...নিজে চেষ্টা করবে।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গানটা যেন সিচুয়েশনটার সঠিক ব্যাখ্যা করছে: "কূল নাই সীমা নাই অথৈ দরিয়ার পানি।" হ্যাঁ আর্জেন্টিনাও তো পায়নি। কি বলুনতো? ঠিক ধরেছেন...হালে পানি পায়নি।
যাগ্গে, ক্রমেই ম্যাচটা একতরফা হয়ে উঠছিলো। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের ম্যাচের মতো। দুই দলের ক্লাসের যে বিস্তর ফারাক! সবই পরিষ্কার হয়ে উঠছিলো, একেবারে জলের মতো।
একটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল যদি প্রতি পদে অপমানিত-অপদস্থ হয়ে সারা পৃথিবীর সামনে...ভাবুন তো কি বাজে একটা ব্যাপার !
অবশেষে ধৈর্য্যচ্যুতি। লাল কার্ড পেলো, আগের ম্যাচের ত্রাতা এনজো। ব্যাস, দশজনের আজেন্টিনা। প্রায় অসম্ভব একটা একুয়েশনে এসে দাঁড়ায় ম্যাচ।
একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়তে লাগলো তাদের গোল মুখে। তাদের বাঁচিয়ে রাখছিলো গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
গোটা ম্যাচে প্রায় 12 খানা সেভ করে সে।খেলাটা আদৌ স্পেন vs মেসি নয়, স্পেন vs মার্টিনেজ হয়ে উঠলো শেষের দিকে।
ভাবুনতো একবার। কোটি কোটি অন্ধ আর্জেন্টিনা ভক্ত। তাদের মন কি মানে ? সবাই ভাবছিল যা হোক মাহোক করে এক্সট্রা টাইম মার্টিনেজ ম্যাচটি ঠেলে দিতে পারলেই হলো।
তার পর পেনাল্টি শ্যুটআউট...আগের ফাইনালের মতোই মার্টিনেজের গোল বাঁচিয়ে ঘাড় দুলিয়ে নাচ। কিন্তু ঈশ্বর তো সেই স্ক্রিপ্ট লেখেন নি।
106 মিনিটে একটি মাত্র ডিফেন্সিভ ল্যাপ্স, সব শেষ। এবার পিছিয়ে থেকে গোল শোধ করা আর হলোনা আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপের হলো হাতবদল। লা রোজায় রাঙা আজ ট্রফি।
আর আর্জেন্টিনা ?
গোটা টুর্নামেন্টেই তাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে, কাউন্সিলের এর টিম, কমিটির টিম ফি*ফা ব*য় ইত্যাদি শুনতে হয়েছে। ট্রফি জেতাটাই হতো সব সমালোচনার মোক্ষম জবাব। কিন্তু হয়নি।স্বয়ং ঈশ্বরও হয়তো চাননি যে তারা জিতুক এবার। বলতে দ্বিধা নেই, স্পেনই যোগ্য বিজয়ী।
শেষে আসি মেসির কথায়। জয় দিয়েই শেষ হবে সবার সব কিছু, এটা তো হয়না। তাহলে গোটা পৃথিবীটাই প্রেডিক্টিবল হয়ে যাবে যে!
তাহলে ঈশ্বর আর মানুষের মধ্যে পার্থক্যই থাকবেনা যে! ভাবুন তো ব্রাডম্যানের কথা ! শেষ টেস্ট ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। বেশি নয় আর 4 রান হলেই পারফেক্ট 100 টেস্ট গড় হয়ে যেত। কিন্তু হয়নি।
যাগ্গে, সব শেষে এটাই বলার, নতুনের জয় হয়েছে । তৈরী হয়েছে নতুন ইতিহাস। এটাই হয়তো শ্রেয়। আবার অপেক্ষা চার বছরের। 2030।