বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভার্চুয়াল দুনিয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগকে যেমন সহজ ও দ্রুত করেছে, ঠিক তেমনি এর অন্ধকার দিকটিও প্রকট হয়ে উঠছে ক্রমশ। সাইবার বুলিং, এই অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে দেয়। এটি এমন এক অদৃশ্য সামাজিক ব্যাধি, যা ভুক্তভোগীর শরীরে কোনো দৃশ্যমান ক্ষত তৈরি না করলেও মন এবং স্বাভাবিক জীবনকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ঝাঁজরা করে দেয়। ডিজিটাল ডিভাইস, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেনস্থা, হুমকি, অপমান বা ব্ল্যাকমেইল করাকেই সাইবার বুলিং বলা হয়। সাধারণত ক্ষতিকর ট্রলিং, চরিত্র হনন, গুজব ছড়ানো কিংবা অনুমতি ছাড়া ছবি বিকৃত করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া,সাইবার বুলিংয়ের পার্ট। ভার্চুয়াল জগতের এই বিষাক্ত বুলির শিকার হয়ে তরুণ সমাজ একটি শ্রেণী গভীর মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমগুলো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে, তাই ভুক্তভোগী ব্যক্তি ঘরের ভেতরে থেকেও নিজেকে কোথাও নিরাপদ মনে করতে পারেন না। অনবরত মানসিক নির্যাতনের ফলে তাদের মাঝে তীব্র হতাশা, চরম একাকীত্ব ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। লোকলজ্জা এবং সমাজের কটু কথার ভয়ে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণী পড়াশোনা বা চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, চরম পর্যায়ে এই মানসিক চাপ ও সামাজিক অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহবধূ,অদৃশ্য এই আতঙ্কের হাত থেকে কেউই সুরক্ষিত নয়।
আইনের দিক থেকে ভারতে সাইবার বুলিং মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু খামতি রয়ে গেছে। সাইবার বুলিং শব্দটিকে সরাসরি চিহ্নিত করে দেশে কোনো নির্দিষ্ট বা স্বতন্ত্র আইন নেই। ফলে ভুক্তভোগীদের ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিভিন্ন ধারা, যেমন গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা অশ্লীলতা ছড়ানোর ধারার ওপর নির্ভর করে পুলিশে অভিযোগ জানাতে হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক কলঙ্কের ভয় এবং আইনি জটিলতার কারণে ভিক্টিম, অপরাধকে নথিভুক্ত করান না, যা অপরাধীদের সাহস আরও বাড়িয়ে দেয়। এই নীরব মহামারী থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন,সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ। শুধু কঠোর আইন দিয়ে এই মানসিকতা বদলানো সম্ভব নয়, এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সচেতনতা। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সঠিক নিয়ম এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের পাঠ দেওয়া জরুরি। একই সাথে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোরও উচিত, ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ও আপত্তিকর কনটেন্ট ব্লক করার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কঠোর করা। অপরিচিত কোনো লিংকে ক্লিক না করা, পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত রাখা এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি। সর্বোপরি, ভার্চুয়াল জগৎকে নিরাপদ রাখতে হলে আমাদের নিজেদের ব্যবহারের মানসিকতা বদলাতে হবে। স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটিরও যে অনুভূতি আছে, এই বোধটুকু জাগ্রত করলেই একটি সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে না পারলে, এই ডিজিটাল প্রগতি একদিন আমাদের পুরো প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।