অস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্য ভবিষ্যতে আর শুধুমাত্র আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হতে চায় না ইজ়রায়েল। দেশের প্রধান বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, নিজেদের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম তৈরির ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। তাঁর এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে, ইজ়রায়েল কি আবার ইউরোপের দিকে সামরিক সহযোগিতার জন্য হাত পাততে চলেছে? ইজ়রায়েলের জন্মের সময় থেকেই প্রতিবেশী আরব দেশগুলির সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়। ১৯৪৮ সালে দেশটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরেপরেই মিশর, সিরিয়া, জর্ডন, লেবানন ও ইরাক তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সৌদি আরব ও ইয়েমেনও আরব পক্ষকে সমর্থন দিয়েছিল তখন। সেই সময় ইজ়রায়েলের হাতে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল আধুনিক অস্ত্রের। ভারী কামান, উন্নত যুদ্ধবিমান কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী, কোনওকিছুই তেমন তাদের হাতে ছিল না। এই পরিস্থিতিতে অস্ত্রের সন্ধানে ইউরোপের থেকে সাহায্য চান ইজ়রায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র তিন বছর অতিক্রান্ত হতেই তৈরি হয়েছিল ইজ়রায়েল। অথচ সেই যুদ্ধেই নাৎসি জার্মানির হাতে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি নিহত হয়। ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস! পরবর্তীতে সেই জার্মান অস্ত্রই ইজ়রায়েলের আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৮ সালে প্রথম আরব-ইজ়রায়েল যুদ্ধের আগে চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে গোপনে অস্ত্র কেনাবেচার কারবার শুরু করে ইহুদি নেতৃত্ব। সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণ জার্মান অস্ত্র মজুত ছিল। অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলিও তখন চালু ছিল। কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়া তখন সোভিয়েত প্রভাবের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফলে পুরনো জার্মান অস্ত্রের বড় অংশ তাদের কাছে অতিরিক্ত হয়ে মজুত ছিল। এই সুযোগ কাজে লাগায় ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী। বেন-গুরিয়নের নির্দেশে এহুদ আভরিয়েল নামে একজন প্রতিনিধি চেকোস্লোভাকিয়ায় গিয়ে অস্ত্র কেনার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেন। প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি গোপন রাখতে নানা ভুয়ো নথি তৈরি করা হয়। সরকারি কাগজে দেখানো হয়, অস্ত্রগুলি আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় যাচ্ছে। পুরো অভিযানটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বালাক’। সমুদ্র ও আকাশ, উভয় পথেই অস্ত্র ইজ়রায়েলে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করা হয়। ব্রিটিশ নজরদারি এড়িয়ে জাহাজে করে অস্ত্র পাঠানো হত। খাবারের বস্তার আড়ালেও রাখা হত বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম। অন্য দিকে, পুরনো জার্মান বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে বিমানপথে অস্ত্র প্রেরিত হয়। এর জন্য ভুয়ো সংস্থার নাম পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল এবং কয়েকটি মার্কিন মুলুকে তৈরি পরিবহণ বিমানও ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এই গোপন অভিযানের মাধ্যমে ইজ়রায়েল বিপুল সংখ্যক রাইফেল ও মেশিনগান সংগ্রহ করে। প্রায় ৩৪ হাজারের বেশি কার৯৮কে রাইফেল এবং ৫,৫০০-র বেশি এমজি ৩৪ ও এমজি ৪২ মেশিনগান তাদের হাতে সেসময় চলে আসে বলে, ইতিহাসবিদরা দাবি করেন । এর পাশাপাশি ২৫টি অ্যাভিয়া এস-১৯৯ যুদ্ধবিমানও ক্রয় করা হয়েছিল। এই অস্ত্রই যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে দিতে তৎকালীন বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৯৪৮ সালের মে মাসের শেষ দিকে মিশরের সেনাবাহিনী তেল আভিভের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। সেই সময় ইজ়রায়েলি বাহিনী কঠিন সাঁড়াশি চাপে ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর পর মিশরীয় বাহিনীর আক্রমণ থেমে যায়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ইজ়রায়েলের পক্ষে অনুকূল হতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য ইজ়রায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক সহযোগী হয়ে ওঠে আমেরিকা। অস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের উপর তেল আভিভের নির্ভরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাতের পর সেই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়। ইজ়রায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও বর্তমানে যথেষ্ট মজবুত। ফলে নেতানিয়াহুর নতুন নীতিতে দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপ কিংবা ভারতের মতো দেশগুলির সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও সেক্ষেত্রে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আমেরিকার উপর নির্ভরতা কমানোর এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।