১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রি করে এই পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘটপটের পরিবর্তে প্রতিমায় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। তবে জগদ্ধাত্রী পূজার আসল ইতিহাস জানতে গেলে আরও কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে।
জগদ্ধাত্রী শব্দের অর্থ কি?
জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ “জগৎ+ধাত্রী। জগতের (ত্রিভুবনের) ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)।” ব্যাপ্ত অর্থে দুর্গা, কালী সহ অন্যান্য শক্তিদেবীগণও জগদ্ধাত্রী। তবে শাস্ত্রনির্দিষ্ট জগদ্ধাত্রী রূপের নামকরণের পশ্চাতে রয়েছে সূক্ষ্মতর ধর্মীয় দর্শন।
জগদ্ধাত্রী দেবী কে?
জগদ্ধাত্রী দেবী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ; গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পৃষ্ঠে দণ্ডায়মান। দেবীর গাত্রবর্ণ উদিয়মান সূর্যের ন্যায়। জগদ্ধাত্রী পূজা হল \'মা\'-এর উদযাপন, যিনি বিশ্বকে একত্রিত করেন। তিন চোখের দেবী একটি হাতির উপর মহিমান্বিতভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যা মৃত রাক্ষস করিন্দ্রাসুরের প্রতীক। তিনি একটি সিংহে চড়েন এবং তার চার হাতে একটি শঙ্খ, একটি ধনুক, একটি তীর এবং একটি চক্র ধারণ করেন।
জগদ্ধাত্রী পূজা কেন হয়?
হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্রগুলোতে বিভিন্ন দেবদেবীর জন্মকথা বর্ণনা করা থাকলেও জগদ্ধাত্রী নিয়ে খুব বিস্তর কিছু পাওয়া যায় না! এক মতে— ত্রেতা যুগের সূচনায় করীন্দ্রাসুর নামে এক হস্তীরূপী অসুরকে বধ করবার জন্য দুর্গার মতোই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মিলিত তেজপুঞ্জ থেকে সিংহবাহিনী, চতুর্ভুজা এই দেবীর জন্ম! জগদ্ধাত্রীর চার হাতের উপরের দুটোয় থাকে চক্র ও শঙ্খ এবং নীচের দুটোতে পঞ্চবাণ ও ধনুক!
আবার অন্য এক মতে, কোনও অসুর বধের জন্য নয়, অগ্নি, পবন, বরুণ ও চন্দ্র— এই চার দেবতার দর্প চূর্ণ করবার জন্য দেবী জগদ্ধাত্রীর উদ্ভব! শাস্ত্র মতে, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে হয় জগদ্ধাত্রীর পুজো! জগদ্ধাত্রীর এই মূর্তির রূপকল্পনা করেন চৈতন্য-পরবর্তী শাস্ত্রকার কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ! কালীর মতো জগদ্ধাত্রী-মূর্তিরও একটা রূপবর্ণনা তিনি তাঁর তন্ত্রসার গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে যান!
কোন কোন পন্ডিত গণ মনে করেন, মা দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের পর ধরাধাম লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে বিশ্বের জীবকূলকে রক্ষণাবেক্ষণে “জগৎ+ধাত্রী। জগতের (ত্রিভুবনের) ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)।” ব্যাপ্ত অর্থে দুর্গা, কালী সহ অন্যান্য দেবী শক্তি গুনে জগদ্ধাত্রীর আবির্ভাব। তবে শাস্ত্র নির্দিষ্ট জগদ্ধাত্রী রূপের নামকরণের পশ্চাতে রয়েছে আরও সূক্ষ্ম ধর্মীয় দর্শন।
নদিয়ার জমিদার বংশের দেওয়া সূত্র অনুসারে বলা হয়ে থাকে, কৃষ্ণচন্দ্রের অতিরিক্ত ইংরেজ-প্রীতির কারণে রূষ্ট হয়ে বাংলার নবাব মীরকাশিমের আদেশে কারাগারে বন্দী হন সপুত্র কৃষ্ণচন্দ্র! এক বিজয়া দশমীর দিন তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।! নৌকাযোগে কৃষ্ণনগর ফেরবার সময়ে নদীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন দেখে রাজা খুবই দুঃখ পান, কারণ বন্দী থাকার কারণে সে বছর আর তাঁর দুর্গাপুজো করা হয়ে ওঠেনি! সে রাতেই নাকি তিনি দেবী জগদ্ধাত্রীর স্বপ্নাদেশ পান যে সামনের কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষে দেবীর পুজো করবার জন্য!
ভিন্নমত জনশ্রুত আছে,ইংরেজদের সাথে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সখ্য়তা থাকার কারণে বাংলার নবাবের রোষানলে পড়েন। নবাবের সেনা এসে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দি করে নিয়ে যায়। জলঙ্গীর নদীপথে যাওয়ার সময় রাজা দেখেন নৌকা করে মা দুর্গাকে মন্ডপে আনা হচ্ছে। ব্যথিত মনে মা দুর্গাকে দুর থেকে প্রনাম করে বলেন - মা তুমি আমায় রক্ষা কর। তাড়াতাড়ি ফিরে এসে তোমার পুজো করব। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কথা রেখে পরবর্তি চান্দ্রমাসে শুক্লা তিথিতে জগজ্জননীর পূজা আরম্ভ করেন।
কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজা কে শুরু করেন?
বাংলার নদীয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী কালে রিষড়া, চন্দননগর, ভদ্রেশ্বর,হুগলিতে খুবই জনপ্রিয়।