থিমপুজোর জাঁকজমক ছেড়ে সাবেকি পুজোর ঐতিহ্য আর বনেদিয়ানা উপভোগ করতে চান? ঘুরে দেখুন কলকাতার এই কয়েকটি প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজো
কলকাতার বনেদি পুজোর ইতিহাসে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ “দেবী মর্ত্যে এলে সাজেন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে, ভোজ সারেন অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে, আর নাচ দেখেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে।” বছরের পর বছর ধরে মুখে মুখে ফিরেছে এই প্রবাদ বাক্য।
কিন্তু কীসের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রবাদ?
তিন বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে কী ভাবে জড়িয়ে গেল এমন আলাদা আলাদা পরিচয়?
সেই উত্তর খুঁজতে ফিরে দেখতে হয় কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর পুরনো ইতিহাস।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে এই প্রচলিত প্রবাদের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক কারণ। ১৮৩৯ সালে শিবকৃষ্ণ দাঁ-র হাত ধরে জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকেই শুরু হয়ে যায় বনেদি বাড়ির পুজোর এই আচার অনুষ্ঠান। পুজো শুরুর সময়কাল থেকেই দাঁ বাড়ির প্রতিমা বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছিল তার অপূর্ব অলঙ্কারের জন্য। দেবীর সাজসজ্জায় থাকত আভিজাত্যের ছোঁয়া।
শিবকৃষ্ণ দাঁ নিজে যেমন সোনার গয়নার ঝলমলে সাজে নিজেকে সাজিয়ে রাখতেন তেমনই তার সাঁধ ছিল ঘরের মেয়ে উমাকেও সাজিয়ে তুলবেন একেবারে মনের মতো করে। কথিত আছে সেই আমলে শিবকৃষ্ণ দাঁ দেবীকে সাজিয়ে তুলতেন চোখধাঁধানো হিরে-চুনী বসানো অলঙ্কারে। দেবীর গয়না এবং শাড়ি তিনি আনতেন সুদূর প্যারিস এবং জার্মানি থেকে।
আজও সেই রীতি অনুসারে দাঁ বাড়িতে দেবী সেজে ওঠেন ভেলভেটের শাড়িতে সেই সঙ্গে থাকে দেবীর গা ভর্তি ঝলমলে অলঙ্কার। দেবীর সাজসজ্জার এই জৌলুস থেকেই লোকমুখে ছড়িয়ে পরে ''দেবী সাজেন দাঁ বাড়িতে''।
কথিত আছে দাঁ বাড়ির রাজকীয় সাজে সেজে উমা পাড়ি দেন উত্তর কলকাতার আর এক বনেদি বাড়ি অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে। সাজের পর এখানে এসে শুরু হয় দেবীর ভোজপর্ব। পুজোর সূচনাকাল থেকেই দেবীকে নিবেদন করা হয় রাজকীয় ভোগ। থাকতো:
মাখনের নৈবেদ্য
চালের নৈবেদ্য
নানা রকমের ভাজাভুজি
লুচি
রাধাবল্লভী
বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি-সহ হরেক রকমের পদ। সেই খ্যাতিই জায়গা করে নেয় প্রবাদে যে দেবী ভোজ সারেন ''অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে''।
সবশেষে উমার গন্তব্য শোভাবাজার রাজবাড়ি। প্রবাদে বলে, এখানে নাকি দেবী রাত জেগে নাচ দেখেন। অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়ির এই দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল আভিজাত্য এবং সামাজিক জৌলুসেরও বড় মঞ্চ।
শোনা যায়, নবকৃষ্ণ দেব তাঁর বাড়ির পুজোয় নামী-দামি বাইজিদের নিয়ে আসতেন। ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য থাকত বিশেষ আপ্যায়নের বন্দোবস্ত, আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোনা যেত গানের সুর, নাচের তালে তালে জমে উঠতো উৎসবের আসর।
দুর্গাপুজোর সেই এলাহী মনোরঞ্জনের আয়োজনের কথা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে লোকমুখে। সময়ের স্রোত পেরিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির নাচঘরের সেই জলসাই হয়ে ওঠে কলকাতার বনেদি পুজোর এক কিংবদন্তি অধ্যায়।
আপনার জন্য রইল আরও ৪ টি সেরা বনেদি বাড়ির খোঁজ
সাবর্ণ রায়চৌধুরির পুজো
সাবর্ণ রায়চৌধুরির বাড়ির পুজোকে এই শহরের প্রাচীনতম পুজোগুলির অন্যতম বলে মনে করা হয়। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই পুজোয় আজও অটুট সাবেকিয়ানার ছোঁয়া। বরিষার পুরনো দুর্গাদালান, আটচালার প্রতিমা আর লাল সিমেন্টের বাঁধানো থামগুলি যেন সেই সুদূর অতীতের নীরব সাক্ষী।
বদনচন্দ্র রায় বাড়ির পুজো
থিম পুজর ভিড়ে সাবেকিয়ানার স্বাদ পেতে হলে মধ্য কলকাতার বদনচন্দ্র রায়ের বাড়ির পুজো অবশ্যই ঘুরে দেখতে পারেন। প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো এই পুজোয় আজও বৈষ্ণব মতে দেবীর আরাধনা হয়। এখানে পশুবলির কোনও রীতি নেই। সাবেকি আচার আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেতে পুজোর সময়ে ঘুরে আসতে পারেন এই বনেদি বাড়িতে।
পাথুরিয়াঘাটার পুজো
কলকাতার সবচেয়ে বড় ঠাকুরদালান দেখতে হলে একবার যেতেই হবে উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের খেলাট ঘোষ বাড়ির পুজোয়। এখানকার প্রতিমারও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। নবপত্রিকা থেকে বিসর্জন প্রতিটি পর্বেই আজও মানা হয় বিশেষ কিছু রীতি। আর দেবীর নৈবেদ্যে থাকে বাড়ির মহিলাদের হাতে তৈরি মিষ্টি, যা এই পুজোর ঐতিহ্যকে আরও আপন করে তোলে।
রানি রাসমণিরপুজো
মধ্য কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপুজো। উনিশ শতকের জানবাজারের এই বাড়িতে আজও নিষ্ঠা ও সাবেকিয়ানা মেনেই হয় দেবীর আরাধনা। প্রায় ২২ ফুটের প্রতিমার গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার মতো, সরস্বতীর মুখ সাদা আর অসুরের মুখ সবুজ। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যই আলাদা করে চেনায় এই পুজোকে।