কোথায় প্রথম দুর্গাপূজো শুরু হয়েছিল--তা সঠিকভাবে কিছু জানা যায় না। এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে ভারতের দ্রাবিড়ীয় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়।। সিন্ধু সভ্যতায় দেবীমাতার, তিনমাথা যুক্ত দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। শিবের অর্ধাঙ্গিনী দুর্গা হিসাবে অথবা দেবী মাতা হিসাবে পূজা করা হত। তবে সঠিক কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।
মার্কন্ডেয় পুরাণ বা শ্রী শ্রী চণ্ডী পুরাণ মতে বলিপুরের রাজা, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় শান্তিনিকেন বোলপুর, সেখানকার রাজা রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপুজো করেন। তিনি মা দুর্গার মহিষাসুরমর্দ্দিনি রূপকে পুজো করে। এই রূপেই দেবী দুর্গা বঙ্গে অধিক পূজিতা। এই রূপে দেবী মহিষ রূপি অসুর, যা অশুভ শক্তির প্রতীক, তাকে বধ্ করে শুভ শক্তির বিজয় ঘোষণা করেন। বোলপুরে মেধা মুনির আশ্রমের কাছেই আছে তার এই পুজাস্থল। বাংলায় অধিকাংশ মানুষ প্রায় শক্তির উপাসক,বা শাক্ত। তাই বাংলার মানুষের কাছে এই দুর্গাপুজোর মাহাত্ম আলাদা। দুর্গা পুজোর মাধ্যমে নারী রূপি শক্তির আরাধনা করে বাংলার মানুষ। এছাড়া অনেক ঐতিহাসিকের মতে দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলার পাল সাম্রাজ্যে পূজিতা হতেন দেবী দুর্গা।পাল বংশের রাজারা দেবী দুর্গার আরাধনা করতেন। সেই সময় দেবীর মহিষাসুরমর্দ্দিনি রূপের অনেকগুলি মূর্তি তৈরি করে ছিলেন পাল বংশের রাজারা। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস কতটা দীর্ঘ এবং গৌরবময়।
তবে ঐতিহাসিকদের সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য মতামত, সপরিবার দুর্গা প্রতিমার সাজ ও পূজার প্রচলন বাংলায় প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়নের পূজায়। রাজা কংস নারায়ন ছিলেন মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুক ভট্টের পুত্র। দুর্গাপূজার রীতি-মন্ত্র ও সামগ্রিক নির্মাণ করেন কংসনারায়ণের কুল পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী। মিথিলার প্রসিদ্ধ পন্ডিত বাচস্পতি তাঁর গ্রন্থে দুর্গা প্রতিমার পূজা পদ্ধতির সবিস্তার বর্ননা দিয়েছেন। কথিত আছে, রাজা কংসনারায়ণ এই দুর্গাপুজো উপলক্ষে রাজকোষ থেকে তৎকালিন তিন লক্ষ টাকা খরচ
করেছিলেন। উনার রাজত্বের সমস্ত প্রজারাই পুজোর প্রসাদ গ্রহন করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে কৃষ্ণনগরের অধিপতি নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর এবং শোভাবাজার রাজবাড়ীর পূজা আয়োজনের পর থেকেই জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছায় যে পলাশীর যুদ্ধ জয়ের পরে ক্লাইভ গির্জায় না গিয়ে আনন্দ উৎসবের জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য সেই সময়েই প্রথম দুর্গা পূজায় অহিন্দু সুলভ আচরন ঢুকে পড়ে, আয়োজন করা হয় বাইজি নাচের।
বাংলায় পারিবারিক দুর্গাপূজার প্রচলন মোটামুটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার সাবর্ন রায়চৌধুরী বাড়ীর পূজা আয়োজনের মাধ্যমে। যদিও অন্যমতে পারিবারিক দুর্গা পুজার সূচনা হয় ১৬০৯ সালে কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর হাত ধরে। তখনও দুর্গাপূজা ছিল পুরোপুরি জমিদারের ঠাকুরদালান অথবা নাটমন্দিরে সীমাবদ্ধ।
১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার বারো জন ব্রাহ্মণ যুবক মিলে যৌথভাবে আয়োজন করেছিল দুর্গাপূজার। বারো ইয়ার বা বন্ধু মিলে ওই পুজো ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ পূজা নামে খ্যাত হয়ে আছে। সেই থেকেই আজকের বারোয়ারি পুজোর বিবর্তন। আর কলকাতায় ‘বারোয়ারি’ দুর্গাপূজার প্রচলন রাজা হরিনাথ রায়ের হাত ধরে কাশিমবাজার রাজবাড়ীতে। সেদিনের সেই ‘বারোয়ারি’ কথাটি ধীরে ধীরে আজকের ‘সর্বজনীন’ কিংবা ‘সার্বজনীন’ এ রূপান্তরিত হয়েছে।