হঠাৎ আলো নিভে গেলে বুক ধড়ফড় করে? অন্ধকার ঘরে ঢুকলেই অস্বস্তি হয়? এই ভয় শুধুই মানসিক দুর্বলতা নয়, বরং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস বহন করে চলেছে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক। বিজ্ঞানীদের মতে, অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার প্রবণতা মানুষের অন্যতম প্রাচীন 'সারভাইভাল ইনস্টিংক্ট'।
আদিম যুগে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেত। দিনের আলোয় মানুষ শিকারি হলেও রাতের অন্ধকারে তারাই হয়ে উঠত শিকার। চারপাশে ঘুরে বেড়াত সিংহ, হায়েনা, চিতাবাঘের মতো নিশাচর প্রাণী। অন্ধকারে মানুষের চোখ যেখানে প্রায় অকার্যকর, সেখানে ওই হিংস্র প্রাণীরা ছিল অনেক বেশি দক্ষ। ফলে রাত মানেই ছিল মৃত্যু-আতঙ্ক।
গবেষকদের মতে, সেই ভয়ই আজও মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে। জীবাশ্মবিদ রবার্ট হার্ট এবং নৃতত্ত্ববিদ রাসেল সাসম্যান তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, অন্ধকারে উদ্বিগ্ন ও সতর্ক থাকা মানুষদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। আর সেই প্রবণতাই প্রজন্মের পর প্রজন্মে জিনের মাধ্যমে বহন হয়ে এসেছে।
এই ভয় নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নেয় মস্তিষ্কের একটি অংশ- অ্যামিগডালা। বিপদের সম্ভাবনা টের পেলেই এই অংশ শরীরকে সতর্ক করে তোলে। মজার বিষয় হল, অন্ধকারে বিপদ দেখা না গেলেও অ্যামিগডালা ধরে নেয় যে বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই অন্ধকারে মানুষের শরীর ও মন অজান্তেই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় চলে যায়।
মনোবিজ্ঞানী Martin Seligman-এর গবেষণাতেও উঠে এসেছে, অন্ধকার, সাপ বা উচ্চতার মতো ভয় মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত তৈরি হয় এবং সহজে দূর হয় না। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই ভয় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চার থেকে ছয় বছর বয়সে অন্ধকারের ভয় সবচেয়ে তীব্র হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতি ও সমাজেই শিশুদের মধ্যে অন্ধকারভীতি একই রকম ভাবে দেখা যায়। অর্থাৎ, এটি শুধুই গল্প বা পরিবেশ থেকে শেখা ভয় নয়, বরং মানুষের বিবর্তনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক প্রাচীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।