Calcutta Television Network

বর্ণবিদ্বেষ, ধর্মীয় বিভাজন, পিতৃতান্ত্রিকতার ভারতে একজন ফুলন দেবী ছিলেন

বর্ণবিদ্বেষ, ধর্মীয় বিভাজন, পিতৃতান্ত্রিকতার ভারতে একজন ফুলন দেবী ছিলেন

10 August 2026 , 12:40:33 pm

সময়টা ৮০-র দশকের ভারত। বাবরি মসজিদ তখনও অক্ষত। গুজরাট দাঙ্গা তখনও হয়নি। তখনও কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্যসভা ও লোকসভা মিলিয়ে সাংসদ সংখ্যা একক ক্রমিকে নেমে আসেনি। তবু দানা পাকাচ্ছে বিদ্বেষ। যত্রতত্র পোড়া গন্ধ। আর ছাইয়ের গাদায় জ্বলন্ত কয়লা বর্ণবিদ্বেষ। গোটা উত্তরভারত জুড়েই ছবিটা আজও অনুরূপই বলা যায়। তেমনই জালাউন প্রদেশের পুরওয়া গ্রামে বড়ো হচ্ছিলেন এক নারী। যমুনা ও চম্বলের তীরের ছবিটা খানিক রমেশ শিপ্পি দেখিয়েছেন তাঁর কালজয়ী ছবিতে। যদিও বাস্তব আরও নির্মম। মল্ল বর্ণে বড়ো হওয়া একরত্তি মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই হয়েছে লাঞ্ছনা, অবমাননা ও বর্ণবিদ্বেষের শিকার। তিনি ও তাঁর বোনেরা জ্বালানি থেকে গোবরের ঘুঁটে তৈরির কাজ করতেন। আর পরিবারের জীবিকা ছিল ছোলা, সূর্যমুখী কিংবা বাজরা চাষ।

হঠাৎই একদিন পৈতৃক জমিজমা বেদখল হয় স্থানীয় নেতার হাতে। তারপর মাত্র ১১ বছরের শিশুকে কাকার চাপে বিবাহ দিতে বাধ্য হন ত্রিশোর্ধ এক ব্যক্তির সাথে। সেখানে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। অত্যাচারিত শিশু স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে বেশ কয়েকবার। তবু সমাজ নামক এক অচলায়তন জাঁকিয়ে বসেছে প্রত্যন্ত ভারতবর্ষের বুকে। ওই বছরই জুলাই মাসে অপহৃত হন ডাকাত দলের হাতে। সেখানে টানা তিনদিন ধর্ষণ। সেখানেই অন্য এক ডাকাত বিক্রম মাল্লার পছন্দ হয়ে যায় ফুলনকে। পরবর্তীতে তিনিই অস্ত্রচালনা শেখান। ধীরেধীরে ডাকাত দলের চালকের আসনে উঠতে শুরু করেন ফুলন দেবী। দেভারিয়া, কানপুর ও ওরাই অঞ্চলে বিপুল ত্রাস হয়ে ওঠেন ও অন্যদিকে নিম্নবর্ণের দরিদ্র হিন্দুরা তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলেন। যদিও বিক্রমের মৃত্যুতে ডাকাত দলের দৌড়াত্ব খানিক কমে। ফুলন দেবী আবারও অপহৃত হন। ডাকাত দলেরই উচ্চ বর্ণের সদস্য শ্রীরাম তাঁকে নিয়ে চলে যান কানপুরের কাছে বেহমাই গ্রামে। সেখানে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে গণধর্ষণের শিকার হন তিনি। অপেক্ষাকৃত উচ্চ বর্ণের ঠাকুর গোত্রীয় হিন্দুরা ব্যাপক অত্যাচার করেন তাঁর উপর। তারপর একদিন পালান ফুলন দেবী। অবশেষে একদিন বহু বাদানুবাদের পর তিনি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

ভারতীয় রাজনীতির আঙিনাতেও আসেন কিছুদিন বাদে। তৎকালীন ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্যকে পরাজিত করে লোকসভায় যান। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুর সংসদীয় অঞ্চল ঠাকুর সম্প্রদায় অধ্যুষিত হওয়া সত্ত্বেও বিপুল ভোট পান তিনি। যদিও সুখের সময়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সাংসদ থাকাকালীন দিল্লীর বাসভবনের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে শের সিং নামক এক আততায়ী। ভারতের ইতিহাস বহু কিছুর দ্বারা সমৃদ্ধ, আবার বিতর্কিতও বহু আখ্যান। নারী স্বাধীনতার এক অন্য সংজ্ঞা তিনি রচনা করেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষে। হয়ত বারবার হেরেছেন, তবু বীরের মতোই। পিতৃতান্ত্রিকতার গুরুগম্ভীর সাম্রাজ্যের এক খোলা বাতাসের নাম ফুলন দেবী। বহু কলঙ্ক স্পর্শ করেছে তাঁকে, ছুঁয়ে গেছে তাঁর মন-শরীর-নশ্বর কায়া। কিন্তু তিনি অনিরুদ্ধ। তিনি অনির্বাণ। জাতপাত-বর্ণবিদ্বেষের ভারতে এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখা নাম ফুলন দেবী।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN