মুর্শিদাবাদের নওদা ব্লকের পুরাতন আলমপুরে মণ্ডলবাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরে রয়েছে এক অন্যরকম ইতিহাস। প্রায় দেড়শো বছর ধরে চলে আসা এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিধবা ব্রাহ্মণের অভিশাপের কাহিনি। সময় বদলেছে, পরিবার ভাগ হয়েছে, কিন্তু পুজোর পুরনো নিয়মগুলিতে আজও বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বহু বছর আগে মণ্ডলবাড়ির লাগোয়া প্রায় ৮০ বিঘা জমি নিলামে ওঠে। সেই জমি কিনে নেন অটল মণ্ডল। জমির মালিকানা চলে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেই ব্রাহ্মণ বিধবা নাকি অভিশাপ দিয়েছিলেন, ওই জমির ফসল যাঁরা ভোগ করবেন, তাঁদের অকালমৃত্যু হবে। বিধবার সেই কথা অটল মণ্ডলের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কথিত আছে, তিনি ঠিক করেন ওই জমি থেকে পাওয়া ফসলের অর্থ নিজের পরিবারের কাজে খরচ করবেন না। সেই টাকা দেবীর আরাধনায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপরই শুরু হয় বাড়ির দুর্গাপুজো। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মণ্ডল পরিবারে এই পুজো হয়ে আসছে। ষষ্ঠীর দিন মঙ্গল ঘট স্থাপনের মাধ্যমে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পুরনো রীতি মেনে পালকিতে করে নবপত্রিকা আনা হয়। পরিবারের পুজো বৈষ্ণব মতে সম্পন্ন হয় এবং বহরমপুরের একটি ব্রাহ্মণ পরিবার বংশপরম্পরায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
মণ্ডল পরিবারের আরও একটি বিশেষ রীতি হল একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া। পরিবারের বিভিন্ন শরিক আলাদা হয়ে গেলেও পুজোর চার দিন তাঁরা এক জায়গায় মিলিত হন। একই রান্নাঘরে তৈরি হয় ভোগ ও পরিবারের খাবার। পুজোর সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের যোগও বেশ গভীর। সন্ধিপুজো শেষ হওয়ার পর পুরাতন আলমপুর, নতুন আলমপুর এবং রামনগরের প্রায় ৫০০টি পরিবারে লুচি ও মন্ডা প্রসাদ হিসেবে পাঠানো হয়। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পরও থাকে বড় আয়োজন। গ্রামবাসীদের পাত পেড়ে খাওয়ানো হয় লুচি, তরকারি ও বোঁদে। এই পুজোর প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা নিয়ম। বিসর্জনের পরে পুরনো কাঠামো ফিরিয়ে আনা হয় না। রথের দিন নতুন কাঠামো তৈরি করে তার উপর মাটি দেওয়া হয়। বছরের পর বছর ধরে প্রতিমার গড়ন ও নকশাও একই রাখা হয়েছে। পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরনো দুর্গাদালানও। কথিত আছে, অটল মণ্ডল ওই জমির আয়ের টাকায় একসময় একটি দোতলা দুর্গাদালান তৈরি করেছিলেন। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটি নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্মের উদ্যোগে সেই জমির আয় থেকেই গথিক ধাঁচে নতুন একতলা পুজোমণ্ডপ তৈরি করা হয়। সেখানে পুজোর ঘর, ভোগের জায়গা, রান্নাঘর এবং পুরোহিত ও ঢাকিদের থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে সেই দালানেই চলছে দুর্গার আরাধনা। এক বিধবার অভিশাপের গল্প দিয়ে যে পুজোর শুরু, আজ সেটিই মণ্ডল পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে পারিবারিক ঐতিহ্য ও মিলনের অন্যতম প্রতীক। প্রজন্ম বদলালেও পুরনো রীতিগুলিকে আঁকড়ে ধরে এখনও একই নিষ্ঠায় মায়ের আরাধনা করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা।