Calcutta Television Network

বুরারি ট্র্যাজেডি, কুসংস্কার ও মনোরোগ, শেষ করে দিল গোটা একটা পরিবারকে

বুরারি ট্র্যাজেডি, কুসংস্কার ও মনোরোগ, শেষ করে দিল গোটা একটা পরিবারকে

22 August 2026 , 07:37:21 pm

২০১৮ সালের ১ জুলাই, দিল্লির বুরারি এলাকা, আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সব কিছু। কিন্তু তাল কাটলো বেলা গড়াতেই।  ওই এলাকায় বসবাসকারী  চুনডাওয়াত পরিবারের ১১ জন সদস্যের রহস্যময় মৃত্যু পুরো ভারতকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর এই ঘটনা স্থান করে নেয়, ভারতের অন্যতম মাস সুইসাইড কেস গুলোর একটিতে। পরিবারে ছিলেন ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা নারায়ণী দেবী, তাঁর দুই ছেলে ভুবনেশ ও ললিত, দুই পুত্রবধূ সাভিতা ও টিনা, মেয়ে প্রতিভাধন এবং তাঁদের সন্তানেরা। এলাকার অত্যন্ত ভদ্র, শিক্ষিত এবং ধার্মিক হিসেবে পরিচিত এই পরিবারের একটি মুদি দোকান ও প্লাইউডের ব্যবসা ছিল এবং প্রতিবেশীদের সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। সেই অভিশপ্ত সকালে প্রতিদিনের মতো দোকান না খোলায় প্রতিবেশী গুরুচরণ সিং, ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রথম তলার হলরুমে সিলিং থেকে ১০টি মৃতদেহ ঝুলতে দেখেন। প্রত্যেকের চোখ কাপড়ে বাঁধা, মুখ টেপ দিয়ে আটকানো এবং হাত পেছন থেকে বাঁধা ছিল, আর অন্য একটি ঘরে মেঝেতে পড়ে ছিল প্রবীণ সদস্যা নারায়ণী দেবীর দেহ।

তদন্তের সময়,পুলিশ ঘর থেকে কোনো লুঠপাটের চিহ্ন পায়না। কিন্তু তল্লাশি চালিয়ে ১১টি ডায়েরি উদ্ধার হয়, যা গত ১১ বছর ধরে লেখা হচ্ছিল। তার মধ্যে ললিতের ডায়েরির লেখাগুলির সাথে মৃতদেহগুলি যেভাবে উদ্ধার হয়েছে তার হুবহু মিল পাওয়া যায়, যেখানে হাত-পা বাঁধা এবং ফাঁসি পরা অবস্থায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়ানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল। এই ঘটনার মূল হোতা ছিলেন পরিবারের ছোট ছেলে ললিত চুনডাওয়াত। ২০০৭ সালে বাবা ভোপাল সিং মারা যাওয়ার পর ললিত গভীর ট্রমার মধ্যে চলে যান এবং তাঁর কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পর অলৌকিক উপায়ে তাঁর কণ্ঠস্বর ফিরে এলে ললিত দাবি করেন যে বাবার আত্মা তাঁর শরীরে ভর করেছে। পরিবারের সদস্যরা ললিতের এই অলৌকিক ক্ষমতা বিশ্বাস করতে শুরু করেন এবং ললিত বাবার আত্মার নির্দেশ অনুযায়ী ডায়েরি লিখে পুরো পরিবারকে সেই নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেন। 

ডায়েরির শেষ পাতায় 'বট পূজা' বা বটবৃক্ষের পুজো নামের একটি বিশেষ আচারের উল্লেখ ছিল, যেখানে পরিবারটিকে বটগাছের ঝুরির মতো ঝুলে এই ক্রিয়াটি করতে হতো। ললিত তাঁর পরিবারকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন, যে এই আচার চলাকালীন কেউ মারা যাবে না, বরং শেষ মুহূর্তে তাঁদের মৃত বাবা এসে সবাইকে বাঁচিয়ে নেবেন। এই অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে উচ্চশিক্ষিত প্রিয়ঙ্কা সহ পরিবারের ১০ জন সদস্য হাসিমুখে ফাঁসির দড়িতে গলা দিয়েছিলেন, যা আসলে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নয় বরং অলৌকিক সমৃদ্ধি পাওয়ার আশায় করা হয়েছিল।

অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বুরারির ঘটনাটি 'শেয়ার্ড সাইকোসিস' (Shared Psychosis) বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'Folie à Famille'-র একটি উদাহরণ। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো, প্রধান কর্তৃত্ব (Dominant Figure), যেখানে ললিত ছিলেন পরিবারের মূল চালিকাশক্তি। বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি ললিত,তার অন্ধ বিশ্বাস বাকিদের মনেও গেঁথে দিয়েছিলেন এবং পরিবারের প্রশ্নহীন আনুগত্যের কারণে কেউ এই আত্মঘাতী আচারের বিরোধিতা করেননি। দিল্লি পুলিশ এই মামলাটিকে কোনো বাহ্যিক অপরাধ বা খুনের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একটি তান্ত্রিক আচারের ভুল পরিণতির কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু হিসেবে ফাইল বন্ধ করে। বুরারি হত্যাকাণ্ড আধুনিক সমাজকে এই শিক্ষাই দিয়ে গেছে যে শিক্ষা বা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকলেই মানুষ কুসংস্কার মুক্ত হয় না এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাব কীভাবে একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN