২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে চলে যাবে বিশাল গ্রহাণু ‘৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস’। পৃথিবীর সঙ্গে তার সংঘর্ষের আশঙ্কা নেই বলেই এত দিন স্বস্তিতে ছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে অন্য আশঙ্কার কথা। পৃথিবীর দিকে না এলেও মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা মানুষের তৈরি নানা ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে অ্যাপোফিসের। তেমনটা হলে গ্রহাণুটিকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৪ সালে প্রথম এই গ্রহাণুটির সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৩৭০ মিটার লম্বা অ্যাপোফিস পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি এলে দুই মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যে দূরত্ব থাকবে প্রায় ৩২ হাজার কিলোমিটার। মহাকাশের বিশাল পরিসরের তুলনায় এই দূরত্ব যথেষ্ট কম। তবে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, অন্তত আগামী ১০০ বছরে অ্যাপোফিসের সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের কোনও আশঙ্কা নেই। গ্রহাণুটির পৃথিবীর কাছে আসার ঘটনাকে ঘিরে অবশ্য বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ নেই। কারণ এত কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অ্যাপোফিসের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তার ফলে গ্রহাণুটির পৃষ্ঠে কম্পন তৈরি হতে পারে, এমনকি ভেতরের অংশে ধসও নামতে পারে। এতে অ্যাপোফিসের গঠন এবং তার উপাদান সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই বিষয়েই সম্প্রতি ‘প্ল্যানেটারি সায়েন্স’ জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ইটালিয়ান ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লায়েড ফিজ়িক্সের বিজ্ঞানী গিলিয়া শেটিনো এবং মহাকাশ-গতিবিদ আলেসান্দ্রো রসি। গবেষকদের চিন্তার বড় কারণ মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহাকাশ অভিযান, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির কাজের ফলে পৃথিবীর চারপাশে অসংখ্য ছোট-বড় বস্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলির অনেকগুলিই এত ছোট যে পৃথিবী থেকে সেগুলিকে শনাক্ত করা কঠিন। গবেষকদের তৈরি মডেল বলছে, অ্যাপোফিসের পথেও এমন কোনও অজানা বস্তু এসে পড়তে পারে। সংঘর্ষ হলে গ্রহাণুর গায়ে গর্ত তৈরি হতে পারে কিংবা তার আশপাশে ধ্বংসাবশেষ জমতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে। পৃথিবীর কাছাকাছি আসার সময় অ্যাপোফিসকে খুব কাছ থেকে দেখার জন্য ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘র্যামসেস’ এবং নাসার ‘ওসিরিস-অ্যাপেক্স’ মিশন কাজ করবে। কোনও ধাক্কায় গ্রহাণুটির অবস্থান বা পৃষ্ঠের চেহারা বদলে গেলে সেই গবেষণায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছননি। তাঁদের আশা, ২০২৯ সালের আগে মহাকাশের ওই অঞ্চলে থাকা ছোট বস্তুগুলি শনাক্ত করার কাজ আরও জোরদার হবে। নতুন টেলিস্কোপ এবং উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সাহায্যে মহাকাশের অজানা জঞ্জাল সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। অর্থাৎ, অ্যাপোফিস পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক না হলেও তার আগমন মহাকাশবিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিতে পারে এক নতুন অধ্যায়ের দরজা। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে আসতে পারে পৃথিবীর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য মহাজাগতিক আবর্জনার সমস্যাটিও। যেটি নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।