দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধুই ধর্মীয় উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবার, শৈশব, স্মৃতি, মিলন এবং আবেগ। সময় বদলেছে, পুজোর আয়োজনের ধরনও বদলেছে। কিন্তু মায়ের বাপের বাড়ি আসার সঙ্গে যে আত্মীয়তার অনুভূতি বাঙালির মনে তৈরি হয়, তা আজও একই রকম। এই টান যে কত গভীর, তার নানা দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
১৯২৫ সালে মান্দালয় জেলে বন্দি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সেই সময় কয়েকজন বাঙালি রাজবন্দি নিজেদের উদ্যোগে সেখানে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেই পুজোর ছবি। ছোটবেলায় জেলের তৎকালীন সুপারের সঙ্গে সেখানে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন এক যুবক মন্ত্রপাঠ করছেন, দেবীর সামনে ফুল দিচ্ছেন। পরে জানতে পারেন, সেই যুবক আর কেউ নন, সুভাষচন্দ্র বসু। কোনো পুরোহিত উপস্থিতি ছিল কি না, তা তাঁর মনে নেই। কিন্তু বন্দিদশার মধ্যেও পুজো করার সেই আগ্রহই বুঝিয়ে দেয় দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক কতটা গভীর।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিতে আবার ধরা পড়ে কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর অন্যরকম কিছু ছবি। পুজোর সময় বাড়িতে আসতেন নানা পেশার মানুষ। কর্মচারী থেকে পরিবারের সদস্য, উৎসবের কয়েকটি দিনে যেন দূরত্ব অনেকটাই কমে যেত। শিশুদের হাতে আসত পার্বণীর টাকা। নবমীর দিনে বসত যাত্রার আসর। বাড়ির বিভিন্ন অংশে আলাদা জায়গা করে বসতেন পরিবারের মানুষজন। চলতো হইহুল্লোড়। আলো, তেলবাতি, যাত্রা এবং বকশিস, সব মিলিয়ে তৈরি হত এক বিশাল আয়োজন।
সিমলার মহেন্দ্র দত্তের স্মৃতিতেও পাওয়া যায় পুরনো কলকাতার পুজোর ছবি। ছোট প্রতিমা, মাটির গয়না, ঢাকের তালে নাচ—সবকিছুতেই ছিল সহজ সরল আনন্দ। তখনকার পুজোয় আজকের মতো জাঁকজমক না থাকলেও আবেগের অভাব ছিল না কোনোকালেই। শুধু কলকাতার বনেদি বাড়ি নয়, গ্রামবাংলাতেও দুর্গাপুজো ছিল সামাজিক মিলনের বড় উপলক্ষ। সাংবাদিক শশীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে উনিশ শতকের গ্রামের পুজোয় দেখা যায় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে মানুষকে আপ্যায়নের ছবি। পুজোর সময়ে খাবার বিতরণ, ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদের ভোজন এবং বিজয়ার দিনে পরস্পরকে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে তৈরি হত সম্প্রীতির পরিবেশ। এই কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র সেন দুর্গাপুজোকে কেবল পৌরাণিক ‘অকালবোধন’ হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি এমন এক মাতৃআরাধনা, যার আবেদন সব সময়ের এবং সকল বয়সের মানুষের কাছে বিপুল। বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো তাই দেবী আরাধনার পাশাপাশি ঘরের মেয়ের ঘরে ফেরার আনন্দ—যেখানে ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানুষ খুঁজে পায় আপনজনকে।