Calcutta Television Network

দুর্গাপূজার ইতিহাস কি শুধু কংসনারায়ণেই সীমাবদ্ধ?

দুর্গাপূজার ইতিহাস কি শুধু কংসনারায়ণেই সীমাবদ্ধ?

6 August 2026 , 05:32:27 pm

বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে উঠে আসে তাহেরপুরের জমিদার রাজা কংসনারায়ণ এবং তাঁর শাস্ত্রজ্ঞদের উদ্যোগে আয়োজিত পুজোর কথা। অনেকের ধারণা, সেখান থেকেই বাংলায় দুর্গাপুজোর সূচনা। কিন্তু ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অন্য এক ছবিই তুলে ধরে। বাংলার বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের মূর্তি প্রমাণ করে, দেবী দুর্গার আরাধনা কংসনারায়ণের বহু শতাব্দী আগেই প্রচলিত ছিল। সেন যুগের ব্রোঞ্জের দশভূজা দুর্গামূর্তি, পাল যুগের পাথরের ভাস্কর্য কিংবা গুপ্ত যুগের মাতৃকাশীল—সবই সাক্ষ্য দেয় বাংলায় দেবী দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, রাজা কংসনারায়ণের অবদান অন্য জায়গায়। তিনি মূলত একচালার প্রতিমা, সন্তান-সহ দুর্গার পারিবারিক রূপ এবং শাস্ত্রবিধি মেনে আধুনিক শারদীয় দুর্গাপুজোর একটি রীতি প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ, তিনি পুজোর প্রবর্তক নন, বরং পুজোর আধুনিক রূপকার।

প্রাচীনকালের মূর্তিগুলি প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায়, কুষাণ যুগেই দ্বিভূজা দেবী মহিষাসুর বধ করছেন। গুপ্ত যুগে দেবীর দশভূজা রূপ আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাল যুগে সেই রূপ পূর্ণতা পায়; সিংহবাহিনী, দশ হাতে দশ অস্ত্র এবং মহিষাসুরবধের চিরচেনা দৃশ্য ভাস্কর্যে ফুটে ওঠে। সে সময় অষ্টমীতে বীরাষ্টমী বা অস্ত্রপূজার রীতিও প্রচলিত ছিল বলে ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়। পাল-সেন যুগে বাংলার শক্তিসাধনা আরও সমৃদ্ধ হয়। গৌড়েশ্বর বল্লাল সেনের প্রতিষ্ঠিত ঢাকেশ্বরী মন্দির আজও সেই ইতিহাস বহন করে। প্রচলিত মত অনুযায়ী, ঢাকেশ্বরী দেবীর নাম থেকেই 'ঢাকা' নামটির উৎপত্তি। একইভাবে বরেন্দ্রভূমে প্রতিষ্ঠিত গৌড়চণ্ডীও শক্তি উপাসনার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। বাংলার নানা প্রান্তে আজও বহু শতাব্দী ধরে দুর্গার বিভিন্ন রূপে পূজা চলে আসছে। ইছাই ঘোষের আরাধ্যা মা শ্যামরূপা প্রায় ১১০০ বছর ধরে পূজিতা। মালদার সুকুল রাজবাড়ির মা সিদ্ধেশ্বরীর পূজার বয়স প্রায় এক সহস্রাব্দ। ঝাড়খণ্ডের শিখরভূম রাজবংশের কুলদেবী রাজরাজেশ্বরীর পূজাও প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো। গোপভূমের মা শিবাখ্যার আরাধনাও শতাব্দীরপ্রাচীন সময়কাল ধরে অব্যাহত রয়েছে। এসব ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং লোকবিশ্বাস একত্রে স্পষ্ট করে যে বাংলায় দুর্গাপুজোর শিকড় অত্যন্ত গভীর। কংসনারায়ণের উদ্যোগে পুজো নতুন রূপ ও আঙ্গিক পেলেও, দেবী দুর্গার আরাধনা বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে বহু আগে থেকেই অভূতপূর্বভাবে মিশে রয়েছে। তাই দুর্গাপুজোর ইতিহাস শুধু একটি রাজবাড়ি বা একজন রাজার কাহিনি নয়; এটি বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শক্তি উপাসনা এবং লোকবিশ্বাসের এক অবিচ্ছিন্ন ধারার আখ্যান।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN